শনিবার, ১৯ মে, ২০১২

ভারতীয় গণতন্ত্রে ফাটল এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর বিপদাশঙ্কা (২)



 আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী 
কোনো দেশে গণতন্ত্র টিকবে কি টিকবে না, তা নির্ভর করে গণতান্ত্রিক নেতৃত্বের সবলতা ও দুর্বলতার উপর। গণতান্ত্রিক নেতৃত্ব দুর্বল ও নতজানু হলে সেই গণতন্ত্রের বিপর্যয় অবশ্যম্ভাবী। প্রথম মহাযুদ্ধের পর জার্মানীতে যে হিন্ডেনবার্গ সরকার এবং ইতালিতে যে ইমানুয়েল সরকার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিলো, তা ছিলো অত্যন্ত দুর্বল গণতান্ত্রিক সরকার। হিটলারের নাতসি পার্টি এবং মুসোলিনীর ফ্যাসিস্ট পার্টি তাই অতি সহজেই এই দুই সরকারের হাত থেকে ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে দু’টি দেশেই গণতন্ত্রের উচ্ছেদ ঘটাতে পেরেছিলো।
স্বাধীনতা উত্তর ভারতে যে দীর্ঘকাল ধরে গণতন্ত্র টিকতে পেরেছে এবং এখনো নাজুকভাবে টিকে আছে, তার কারণ, কংগ্রেস দলের শতাব্দিকালের দৃঢ় গণতান্ত্রিক রাজনীতির ঐতিহ্য এবং স্বাধীন ভারতে নেহেরুর নেতৃত্বে শক্তিশালী গণতান্ত্রিক সরকারের দীর্ঘকাল ক্ষমতায় অবস্থান। অন্যদিকে পাকিস্তানের মুসলিম লীগ ভারত ভাগ হওয়ার আগে থেকেই একটি গণতান্ত্রিক চরিত্রের রাজনৈতিক দল ছিলো না। মোহাম্মদ আলী  জিন্নার একক ইচ্ছায় ও অঙ্গুলি হেলনে দলটি চালিত হতো। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরও জিন্না নিজে দেশটির গভর্নর জেনারেল হন এবং রাজনীতিকদের বদলে বুরোক্রাটদের দেশের প্রথম সরকারে  গুরুত্বপূর্ণ পদ দখল করতে দেন। ফলে পরবর্তীকালে সাবেক সিভিল বুরোক্রাট গোলাম মোহাম্মদ এবং চৌধুরী মোহাম্মদ আলীর নেতৃত্বে সিভিল বুরোক্রাসি পাকিস্তানের ক্ষমতা দখল করে। তারপর আইয়ুব ও ইসকান্দার মির্জার নেতৃত্বে মিলিটারি বুরোক্রাসি এসে ক্ষমতার সিংহভাগ দখল করে। পাকিস্তান থেকে গণতন্ত্রকে নির্বাসন যাত্রা করতে হয়।
ভারতে যতোকাল কংগ্রেস একটি সবল এবং শক্তিশালী সর্বভারতীয় দল ছিলো এবং নেহেরু ও ইন্দিরা সেই দলের ব্যক্তিত্বশালী নেতা ছিলেন, ততোদিন ভারতীয় গণতন্ত্রের বিপন্ন হওয়ার কারণ ঘটেনি। গণতন্ত্র আঞ্চলিকতার ভিত্তিতে ভাগ ভাগ হয়ে যায়নি। বরং একটি কেন্দ্রীয় ও অবিভাজ্য শক্তি হিসেবে ভারতকে বেষ্টন করে রেখেছিলো। নেহেরু তার দলের মধ্যে সর্বেসর্বা হয়ে উঠলেও প্লুরালিস্টিক রাজনীতির পথ বর্জন করেননি, বরং কেরলের মতো অঙ্গরাজ্যে কম্যুনিস্টদেরও নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় বসতে দিয়েছেন। পরবর্তীকালে ইন্দিরা যেমন দিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গে। বিশ্বের ইতিহাসে নির্বাচনের মাধ্যমে কম্যুনিস্টদের ক্ষমতায় বসা ভারতেই প্রথম।
আধুনিক ভারত গঠনে নেহেরু চীনের চিয়াংকাইশেকের মতো পূর্ণ ধনবাদের (full capitalism)  পথে এগোননি। তিনি সমাজতন্ত্রী ধাঁচের মিশ্র অর্থনীতির (mixed economy) পথ গ্রহণ করেন। ফলে দীর্ঘকাল  ভারতের অর্থনীতিকে প্রাইভেট সেক্টর পাবলিক সেক্টরকে হটিয়ে সর্বেসর্বা হয়ে ওঠেনি। টাটা-বিড়লা, ডালমিয়ারা দেশের অর্থনীতির উপর পূর্ণ কর্তৃত্ব স্থাপন করে রাজনৈতিক পূর্ণ কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠাতেও এগিয়ে যেতে পারেনি।
ভারতীয় গণতন্ত্র যাতে প্রতিক্রিয়াশীল ডানপন্থী রাজনীতির চোরাবালিতে ডুবে না যায়, সেজন্যে নেহেরু প্রধানমন্ত্রী হিসেবে গান্ধী-হত্যার পর পরই  গোঁড়া সাম্প্রদায়িক দল হিন্দু মহাসভাকে নিষিদ্ধ করেন এবং পরে সিপিআই বা ভারতের কম্যুনিস্ট পার্টিকে  কংগ্রেস সরকারের রাজনৈতিক সহযোগী হিসেবে গ্রহণ করেন। কংগ্রেস-সিপিআই মৈত্রী ইন্দিরা গান্ধীর আমল পর্যন্ত বজায় ছিলো। পুরনো ঔপনিবেশিক শক্তি এবং নব্য সাম্রাজ্যবাদীদের চক্রান্ত থেকে নতুন ভারতীয় গণতন্ত্রকে রক্ষার জন্য দেশরক্ষা নীতির ক্ষেত্রে নেহেরু সবচাইতে দূরদর্শী নীতি গ্রহণ করেছিলেন। তিনি প্রচণ্ডভাবে সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী কৃষ্ণমেননকে এনে দেশরক্ষা মন্ত্রীপদে বসিয়েছিলেন এবং পশ্চিমা দেশগুলোর চাইতেও সোভিয়েট ইউনিয়নের কাছ থেকে সমরাস্ত্র কেনার উপর জোর দিয়েছিলেন। তিনি ভারতের সেনাবাহিনীতে সামরিক সহযোগিতার নামে আমেরিকান প্রভাবের অনুপ্রবেশ ঘটুক তা  চাননি।
আমেরিকা এখন সদ্য স্বাধীন এশিয়ান ও আফ্রিকান দেশগুলোতে-বিশেষ করে দেশগুলোর সামরিক বাহিনীতে অস্ত্র সাহায্য, প্রশিক্ষণ ট্রেনিং দেওয়া ইত্যাদির নামে অনুপ্রবেশের নীতি গ্রহণ করেছে এবং গোপনে কোনো সামরিক অথবা অসামরিক নেতাকে লৌহমানব (iron man) হিসেবে সাজাচ্ছে। এই লৌহ মানবদের কাজ ছিলো, সময় ও সুযোগমতো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অযোগ্যতা, অপশাসন ইত্যাদির অভিযোগ তুলে তার পতন ঘটানো এবং বন্দুকের সাহায্যে ক্ষমতা দখল করে স্বৈরাচারী শাসন প্রতিষ্ঠা করা। মার্কিন এডমিনিষ্ট্রেশন এবং পত্র-পত্রিকা তখন তাকে লৌহমানব, দেশটির ত্রাণকর্তা ইত্যাদি নানা খেতাবে ভূষিত করতো। আমেরিকা তখন সিংম্যানরী থেকে আইয়ুব খাঁ পর্যন্ত অসংখ্য লৌহমানব সৃষ্টি করেছিলো।
নেহেরু এই সত্যটি জানতেন। তাই ভারতের দেশরক্ষা ব্যবস্থা ও সামরিক বাহিনীকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে মার্কিন প্রভাব থেকে দূরে রেখেছেন। তিনি আমেরিকার কাছ থেকে উন্নত অস্ত্রশস্ত্র ক্রয় করেছেন। কিন্তু তা ব্যালেন্স করেছেন বেশি করে সোভিয়েট অস্ত্রশস্ত্র ক্রয় করে। সামরিক বাহিনীর প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রেও তিনি সাবেক সোভিয়েট ইউনিয়নের সহায়তা বেশি গ্রহণ করেছেন। চীনের সঙ্গে যুদ্ধে পর্যুদস্ত হয়েও তিনি মার্কিন সামরিক রক্ষা ব্যবস্থা বলয়ে ঢুকতে চাননি। নেহেরুর দেশরক্ষা নীতি ও পররাষ্ট্রনীতি ছিলো পরস্পরের পরিপূরক। তিনি জোট নিরপেক্ষ স্বাধীন পররাষ্ট্র নীতি গ্রহণ করেন এবং মিসরের জামাল নাসের, যুগোস্লাভিয়ার মার্শাল টিটো এবং ইন্দোনেশিয়ার সুকর্নের সঙ্গে মিলিত হয়ে ন্যাম বা জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন গড়ে তোলেন। এই আন্দোলন পঞ্চাশের দশকে দেশে দেশে মার্কিন তাবেদার লৌহ মানবদের অভ্যুত্থানের পথে অনেকটাই বাধা সৃষ্টি করেছিলো। ন্যাম এক সময় এশিয়া ও আফ্রিকায় সদ্য স্বাধীন দেশগুলো গণতন্ত্রের জন্য একটা রক্ষাব্যুহ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।
নেহেরুর পর তার কন্যা ইন্দিরা গান্ধী পরিবর্তিত বিশ্বপরিস্থিতিতেও পিতার পররাষ্ট্র ও দেশরক্ষা নীতি থেকে সরে দাঁড়ায়নি। বরং কিউবার ক্যাস্ট্রো ও মিসরের সাদাত, আলজেরিয়ার বুমেদীন ও বাংলাদেশের শেখ মুজিবের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ন্যামকে শক্তিশালী সংস্থা হিসেবে রাখার চেষ্টা করেন। ইন্দিরা গান্ধীর মধ্যে ‘একনায়কসুলভ’ মনোভাব ছিলো। তা সত্ত্বেও তিনি ভারতীয় গণতন্ত্রের প্লুরালিস্টিক চরিত্র ধ্বংস করেননি। তিনি পিতার মতো ভারতীয় গণতন্ত্রের জনবিচ্যুতি ঠেকাবার জন্য বাম সহযোগিতা ধরে রেখেছেন এবং টাটা বিড়লার পর নতুন ব্রান্ডের আরো শক্তিশালী পুঁজিপতি আম্বানি প্রমুখদের অর্থনীতি ও রাজনীতিতে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করতে দেননি। তিনি নির্বাচনে হেরে গণরায় মেনে নিতে এবং ক্ষমতা হস্তান্তরে এক মুহূর্ত দেরি করেননি। বাংলাদেশের ‘সশিক্ষিত’ নেত্রী খালেদা জিয়ার মতো বলেননি, নির্বাচনে কারচুপি করে তার জয় ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে।
ইন্দিরা-হত্যা কেবল অমৃতসরের স্বর্ণ মন্দিরের (Golden temple) হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য শিখদের কর্মকাণ্ড বলে যারা ভাবেন, তারা আসলে প্রকৃত সত্যের দিকে নজর ফেরাতে চান না। এই হত্যা দেশি ও বিদেশি গণতন্ত্র-বিরোধী শক্তিশালী চক্রেরও অভিপ্রায় ছিলো। ইন্দিরা-হত্যা দ্বারা উপমহাদেশে গণতন্ত্রের শেষ রক্ষাব্যুহটিও ধ্বংস করা হয়। ইন্দিরার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা ছিলো ভারত মহাসাগর-এলাকাকে তিনি জোন অব পীসে (শান্তির এলাকা) পরিণত করবেন। অর্থাত্ এশিয়াকে তিনি সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতা ও স্নায়ুযুদ্ধ থেকে মুক্ত করবেন। তিনি এই প্রতিজ্ঞা পূরণ করার সময় পেলে শুধু এশিয়ার দেশগুলোর নয়, ভারতীয় গণতন্ত্রও সুরক্ষা পেতো। সুতরাং ইন্দিরা-হত্যায় অন্য কোন্ কোন্ চক্র  জড়িত ছিলো তা জানার জন্য খুব একটা গবেষণার প্রয়োজন নেই। দেশি-বিদেশি অনেক রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকই এখন এই হত্যাকাণ্ডের অন্যান্য দিক সম্পর্কেও মুখ খুলছেন।
ইন্দিরা-হত্যার দীর্ঘকাল পর এখন একজন পশ্চিমা রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকই তার সাম্প্রতিক এশিয়া-বিষয়ক এক লেখায় স্বীকার করেছেন, ইন্দিরা-হত্যার পেছনে ভারতীয় রাজনীতি থেকে শক্তিশালী গণতান্ত্রিক নেতৃত্ব অপসারণের একটা চক্রান্তও ছিলো। ভারতের গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে ইন্দিরা-হত্যার ফলে যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়, তা তার পুত্র রাজীব গান্ধী পূরণ করতে পারেননি। সেটা তার পক্ষে সম্ভবও ছিলো না। নেহেরুর রাজনৈতিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করলেও তিনি রাজনীতি-বিমুখ ছিলেন এবং রাজনীতিতে সংশ্লিষ্ট হওয়া তার আদৌ ইচ্ছা ছিলো না, রাজনৈতিক নেতৃত্বদানের ট্রেনিংও তার ছিলো না। তিনি পেশা হিসেবে বিমান চালনা বেছে নিয়েছিলেন এবং চরিত্রে ছিলেন টেকনোক্র্যাট।
বরং ইন্দিরার কনিষ্ঠ পুত্র সঞ্জয় গান্ধী বেঁচে থাকলে নেহেরু পরিবারের রাজনীতির উত্তরাধিকার হয়তো কিছুটা বহন করতে পারতেন। কিন্তু ভারতের গণশত্রুরা সে কথা জানতো বলেই ইন্দিরার আগেই তাকে হত্যা করা হয়। যে বিমান দুর্ঘটনায় তার মৃত্যু হয়, সেটিও অদৃশ্য হস্তের কারসাজির ফল বলে এখন অনেকেই প্রমাণ করার চেষ্টা করছেন। সঞ্জয়ের মৃত্যুর পরই ইন্দিরা বাধ্য হন তার পাইলট জ্যেষ্ঠ পুত্র অনিচ্ছুক রাজীব গান্ধীকে রাজনীতিতে টেনে আনতে।
ভারতীয় গণতন্ত্রের ফাটল শুরু হয় নেহেরু পরিবারের এই অরাজনৈতিক প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর আমলেই। এই সময়ে অত্যন্ত চতুরভাবে ভারতের বিগ বিজনেস এবং বিগ মিডিয়াগুলো তাকে মি. ক্লিন (Mr. clean) আখ্যা দিয়ে তার চাটুকারিতা শুরু করে। মার্কিন পত্র-পত্রিকাতেও তার প্রতিধ্বনি শোনা যায়। মার্কিন মিডিয়ায় বলা হয়, দুর্নীতি ও অযোগ্যতার জন্য ভারতের রাজনীতি ও রাজনীতিকরা দূষিত হয়ে পড়েছিলেন। সোভিয়েট ইউনিয়নের সঙ্গে অতি ঘনিষ্ঠতা এবং মৈত্রী চুক্তির ফলে ভারতের গণতন্ত্র শ্বাস ফেলতে পারছিলো না। যে কোনো সময় ভারতের কম্যুনিস্ট টেকওভার সংঘটিত হতে পারতো। ইতিমধ্যেই ভারতের দু’টি কি তিনটি প্রভিন্সে কম্যুনিস্টরা ক্ষমতা দখল করেছে। এই দারুণ সন্ধিক্ষণে রাজীব গান্ধীর দিল্লিতে ক্ষমতায় বসা ভারতের রাজনীতির জন্য একটি বড় সুসংবাদ। কেউ কেউ এমন কথাও বললেন, ভারতে অসুস্থ ও দুর্নীতিপূর্ণ ডেমোক্রেসির বদলে সুস্থ ও পরিচ্ছন্ন টেকনোক্রাসির যুগ শুরু হলো।
এর আগে দীর্ঘস্থায়ী ভারতীয় গণতন্ত্রের প্রশংসা করলেও মার্কিন পত্র-পত্রিকায় এই গণতন্ত্রের প্রচ্ছন্ন চরিত্র হননও শুরু হয়। তখন পশ্চিমা বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে কম্যুনিস্ট বিরোধী ‘জেহাদের’ অন্যতম প্রধান নায়ক ছিলেন আর্থার কোয়েসলার। দি গড দ্যাট ফেইলড (পরাভূত দেবতা) নামক বহুল প্রচারিত বইয়ের তিনি লেখক। তিনি তার এক বইয়ের শেষ চ্যাপ্টারে কাল্পনিকভাবে দেখান, গোটা ভারত কম্যুনিস্ট দখলে চলে গেছে। ক্ষমতাচ্যুত নেহেরু শেষবারের মতো দিল্লির পার্লামেন্ট ভবন থেকে বেরিয়ে আসছেন। দেখেন তাকে বিদায় সংবর্ধনা জানানোর জন্য কেউ সেখানে উপস্থিত নেই। তার এতোদিনের অনুরাগীরাও অদৃশ্য হয়ে গেছেন। কেবল পার্লামেন্ট ভবনের গার্ডেনের বৃদ্ধ মালি, যে নেহেরুকে রোজ একটি লাল গোলাপ উপহার দিতো, সে আজও একটি লাল গোলাপ হাতে সাশ্রু নয়নে দাঁড়িয়ে আছে।
রাজীব গান্ধী বা মি. ক্লিন টেকনোক্রাটের আমল থেকেই ভারতীয় গণতন্ত্রে ফাটল শুরু। (অসমাপ্ত)
++লন্ডন ১৯ মে শনিবার, ২০১২ইং

শুক্রবার, ১৮ মে, ২০১২

সরকার হার্ডলাইনে গিয়ে লাভবান হবে কি?


আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী
বিরোধী দলের বিরুদ্ধে হার্ডলাইনে গিয়ে সরকার নিজেদের জনবিচ্ছিন্নতা বাড়ানো ছাড়া আর কোনো লাভেরই অধিকারী হবে না। সবচেয়ে বড় কথা, কোনো গণতান্ত্রিক সরকার যখন রাজনৈতিক শক্তি দ্বারা বিরোধী পক্ষকে মোকাবেলা করার বদলে ক্ষমতার লাঠি দ্বারা তাদের দমন করতে চায়, তখনই বুঝতে হবে তারা দুর্বল হয়ে পড়েছেন। তারা এখন একটি উইক গভর্নমেন্ট, মোটেই স্ট্রং গভর্নমেন্ট নয়। অতীতে বিএনপি সরকার এ ধরনের হার্ডলাইন ও দমননীতি দ্বারা ক্ষমতায়
থাকতে পারেনি


বাংলাদেশের রাজনীতি আবার উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। সরকার ও বিরোধী দল আবার রাজপথে মুখোমুখি। হরতালের প্রতি জনসমর্থন নেই, তবু সেই হরতালকে হাতিয়ার করে বিএনপি জোট আবার মাঠে নেমেছে। সরকারও হার্ডলাইনে গেছে। বিএনপি জোটের বিশালসংখ্যক নেতা রাজপথে অরাজকতা সৃষ্টি, ভাংচুরের দায়ে পুলিশি মামলায় জেলে বন্দি। তাতে বিরোধী দলের মিটিং, মিছিল, হরতাল করার জোর কমেছে। কিন্তু জনজীবনে দুর্ভোগ কিছুমাত্র কমেনি, বরং বেড়েছে। ১৭ মে বৃহস্পতিবারের হরতালেও তা প্রমাণ হয়েছে। দেশব্যাপী সকাল-সন্ধ্যা হরতালের ডাক তেমন সফল হয়নি; কিন্তু ভাংচুর, গাড়িতে অগি্নসংযোগ হয়েছে সমানভাবেই।
বিরোধী দল আরও কঠোর কর্মসূচি দেওয়ার ঘোষণা দিচ্ছে। অন্যদিকে সরকারও যে হার্ডলাইনে গেছে, ব্যাপক ধরপাকড় থেকে তা বোঝা যাচ্ছে। রাজায় রাজায় যুদ্ধ হচ্ছে, প্রাণ যাচ্ছে উলুখড়ের। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন, ভারতের অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখার্জি এবং জাপানের উপ-প্রধানমন্ত্রীর সাম্প্রতিক ঢাকা সফর তাদের নিজ নিজ দেশের স্বার্থপ্রণোদিত হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশের প্রধান দু'দলকে তারা সংলাপে বসার পরামর্শ দিয়ে যাওয়ায় এবং দু'দলই সংলাপে আগ্রহ প্রকাশ করায় ঢাকায় মিডিয়াগুলো আশা প্রকাশ করছিল যে, দেশের রাজনীতিতে সংলাপ ও সমঝোতার হাওয়া বইছে। এ আশা যে কত ঠুনকো তা দু'দিন না যেতেই দেখা যাচ্ছে।
বিরোধী দল বিএনপি এবং তার জোটভুক্ত দলগুলো, বিশেষ করে জামায়াত সরকারের সঙ্গে ফলপ্রসূ কোনো সংলাপে আগ্রহী তা দেশের কাউকে সম্ভবত বিশ্বাস করানো যাবে না। তাদের এজেন্ডা আলাদা। এই এজেন্ডা হলো, দেশময় অরাজকতা সৃষ্টি দ্বারা '৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বানচাল করা। জামায়াত লোক দেখানোভাবে এবং বহির্বিশ্বকে বোকা বানানোর জন্য সংলাপে বসার কথা বলছে বটে, কিন্তু তাদের আসল উদ্দেশ্য বিএনপিকে আওয়ামী লীগ ও সরকারের সঙ্গে বিপজ্জনক সংঘাতে জড়িয়ে রেখে দেশময় সন্ত্রাস সৃষ্টি এবং '৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার নস্যাৎ করে দেওয়া। বিএনপি ও তার জোটভুক্ত অন্য দলগুলো জামায়াতের দ্বারা তাদের চক্রান্তে ব্যবহৃত হচ্ছে।
সরকারের এ কথা জানা থাকায় তাদের উচিত ছিল, দেশের অপশক্তির চক্রান্ত থেকে দেশকে মুক্ত করার চেষ্টার অংশ হিসেবে সংলাপে বসার ব্যবস্থা সম্পন্ন করা এবং তার পরিবেশ সৃষ্টির জন্য তিন দেশের নেতার ঢাকা সফরের পর হার্ডলাইন থেকে আপাতত সরে আসা। ইলিয়াস আলী অপহরণ ইস্যুতে কিছুদিন আগের হরতালগুলোতে দাঙ্গা-হাঙ্গামার জন্য অভিযুক্ত বিএনপি নেতাদের পুলিশি মামলায় একেবারে জেলে না পাঠিয়ে জামিনে মুক্ত থাকায় এবং সংলাপে বসার সুযোগ দেওয়া।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠান থেকে শুরু করে বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়ে আলোচনার জন্য সরকার বলছে, বিরোধী দল পার্লামেন্টে আসুক। বিরোধী দল বলছে, সংসদে সরকারের বিরাট সংখ্যাগরিষ্ঠতা। সেখানে গিয়ে আলোচনায় বসে লাভ নেই। সংসদের বাইরে সংলাপ অনুষ্ঠিত হোক। আমার ধারণা, দেশকে সংঘাত থেকে বাঁচানোর বৃহত্তর স্বার্থে সরকার এ দাবি মেনে নিলে সুবিবেচনার পরিচয় দিত। সংসদের বাইরের আলোচনায় একটা ঐকমত্য তৈরি হলে মীমাংসায় প্রস্তাবগুলো যুক্তভাবে সংসদে উত্থাপন করা যেত।
এ ব্যাপারে আওয়ামী লীগের কোনো কোনো নেতার সঙ্গে আলাপ করে জেনেছি, দু'দলের সংলাপ দ্বারা বিভিন্ন রাজনৈতিক ইস্যুতে সমঝোতা হোক বিএনপি তা চায় এটা তারা বিশ্বাস করেন না। তারা মনে করেন, বিএনপি দাতা দেশগুলোর নেতাদের এবং দেশের মানুষকে ধোঁকা দেওয়ার জন্য সংলাপে বসার বাহ্যিক আগ্রহ দেখাচ্ছে। কিন্তু '৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের বিষয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার, তারেক রহমান ও অন্যান্য বিরোধীদলীয় নেতার বিরুদ্ধে আনীত দুর্নীতি, সন্ত্রাসের মামলা এবং অন্যান্য কিছু জাতীয় স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে তারা সরকারকে ছাড় দিয়ে সংলাপ সফল করবে আওয়ামী লীগ হাইকমান্ড তা বিশ্বাস করছে না।
তাদের বিশ্বাস, কোনো না কোনো ছুতো তুলে তারা সংলাপ ব্যর্থ করবে এবং আওয়ামী লীগের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে দেশময় অরাজকতা সৃষ্টি করে অগণতান্ত্রিকভাবে সরকারের পতন ঘটানোর জন্য ইস্যুর পর ইস্যু তৈরি করবে। যেমন ব্রিটিশ আমলে অবিভক্ত ভারতের রাজনৈতিক সমস্যা সমাধানের জন্য কংগ্রেম-লীগ তথা গান্ধী-জিন্নাহ বারবার বৈঠক হয়েছে। কিন্তু কোনোটাই সফল হয়নি। কংগ্রেস দোষ চাপিয়েছে মুসলিম লীগের ওপর। মুসলিম লীগ সেই দোষ কংগ্রেসের ওপর চাপিয়েছে। শেষ পর্যন্ত তৃতীয় পক্ষ র‌্যাডক্লিফের ছুরিতে ভারত ভাগ করে লর্ড মাউন্ট ব্যাটেনের মাধ্যমে দুই দলের ও দুই নেতার ওপর যে মীমাংসা চাপিয়ে দেয়, তারা তা মেনে নিতে বাধ্য হন।
এ কথা সত্য, আমরা তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপ ছাড়া নিজেরা নিজেদের কোনো সমস্যারই সমাধান করতে পারি না। তাতে অনেক সময় আমাদের জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ব বিপন্ন হয়। বিদেশিরা এসে আমাদের ওপর মাতব্বরি করে। উপদেশ দেয়। এ কথা আমাদের জাতীয় নেতারা হয়তো উপলব্ধি করেন না। দ্বিপক্ষীয় সংলাপে না বসার ব্যাপারে আওয়ামী লীগের নেতাদের যুক্তি সঠিক নয়, তা আমি মনে করি না। তথাপি আমার কথা, এখনই হার্ডলাইনে না গিয়ে সরকার বিএনপির শর্ত মেনে সংলাপে বসার আয়োজন করলে ভালো করত। গান্ধী-জিন্নাহ বৈঠকের মতো হাসিনা-খালেদা বৈঠকও সম্ভবত ব্যর্থ হতো। কিন্তু দেশের মানুষ জানতে পারত এই সংলাপ ব্যর্থ হওয়ার জন্য কাদের জেদ এবং অবাস্তব দাবি দায়ী। তারা কী উদ্দেশ্যে দেশে অরাজকতা জিইয়ে রাখতে চায়।
সরকার বলছে, বিরোধী দল অশুভ উদ্দেশ্যে দেশে অরাজকতা সৃষ্টি করতে চায়। বিরোধী দল বলছে, সরকারি দলের জোর-জুলুম, ইলিয়াস আলীর মতো তাদের নেতাদের গুম, খুন ইত্যাদি করার জন্যই দেশের মানুষ হরতাল চায় না জেনেও তারা হরতালে নামতে বাধ্য হচ্ছেন। তাতে দেশে অরাজকতা সৃষ্টি হচ্ছে। বিএনপির সকল নেতা না চাইলেও জামায়াত যে দেশে অরাজকতা সৃষ্টি করতে চায় এ কথা সত্য। কিন্তু বিএনপির কাঁধে চেপে দেশময় অরাজকতা সৃষ্টিতে জামায়াতগোষ্ঠীর এই সুযোগ লাভের পেছনে আওয়ামী লীগ সরকারের দেশ শাসনে ব্যর্থতাও কি দায়ী নয়?
বিএনপির প্রভাবশালী কেন্দ্রীয় নেতা ইলিয়াস আলী (তিনি নিজে যাই হোন) রাজধানী ঢাকা থেকে অপহৃত হওয়ার পর মাসাধিককাল ধরে নিখোজ; পুলিশ, র‌্যাব, গোয়েন্দা সংস্থাগুলো কেউ কোনো খোঁজ করতে পারছে না; এটা কি কাজের কথা? সাগর-রুনি সাংবাদিক দম্পতির হত্যাকাণ্ড আজ পর্যন্ত রহস্যের জালে ঢাকা। এটা কি কোনো সরকারের জন্য গৌরবের কথা? তার ওপর আবার প্রধানমন্ত্রী নিজে বলেন, 'কারও বেডরুমে গিয়ে পাহারা দেওয়া আমাদের দায়িত্ব নয়।' এই উক্তি শুনে দেশের মানুষ হতবাক হয়েছে। বিরোধী দল হিসেবে বিএনপি তার সুযোগ নেবে না?
কোনো কোনো আওয়ামী মন্ত্রী যুক্তি দেখান, বিএনপি-জামায়াতের শাসনামলে আওয়ামী লীগের বড় বড় নেতাসহ অসংখ্য সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করা হয়েছে। তাদের হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত তদন্ত পর্যন্ত বিএনপি সরকার করেনি। দোষীদের শাস্তি দেওয়া দূরের কথা আওয়ামী নেতাদের এই যুক্তি কি ধোপে টেকে? বিএনপি সরকার দেশ শাসনে অযোগ্য, অক্ষম এবং ব্যর্থ প্রমাণিত হওয়াতেই ২০০৮ সালের নির্বাচনে জনগণ এত বিরাট নির্বাচন-সাফল্য উপহার দিয়ে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় বসিয়েছে। তারা এই সরকার বিএনপির মতো ব্যর্থ হবে, দেশকে অপশাসন উপহার দেবে এটা দেখতে চায় না। এখন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় বসে যদি সাবেক বিএনপি সরকারের মতো দেশ শাসনে অযোগ্যতা ও ব্যর্থতাকেই অনুসরণ করে, তাহলে কোন মুখে তারা অতীতের সরকারের নিন্দা করবেন? কতদিন আর পুরনো গাজির গীত গেয়ে দেশবাসীর মন ভোলানো যাবে?
সাবেক রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের এক এপিএসের গাড়িতে কয়েক লাখ টাকা পেতেই এবং সুরঞ্জিত বাবু তার সঙ্গে জড়িত তা প্রমাণ হওয়ার আগেই প্রধানমন্ত্রী ধমক দিয়ে বলেছেন, মন্ত্রীকে পদত্যাগ করতে হবে। মন্ত্রী আজ্ঞা পালন করেছেন। প্রধানমন্ত্রী এটা যদি করতে পারেন, তাহলে এই কথিত দুর্নীতির চেয়েও গুরুতর বিরোধী দলের এক নেতার গুম হওয়া, সাংবাদিক দম্পতির নৃশংস হত্যা, দেশময় অপহরণ, হত্যার সংখ্যা বিপজ্জনকভাবে বেড়ে চলা সত্ত্বেও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অবিলম্বে পদত্যাগ করা উচিত কথাটা কেন বলতে পারছেন না? অথবা তাকে আবুল হোসেনের মতো অন্য মন্ত্রকে সরিয়ে দিয়ে এই পদে একজন যোগ্য ব্যক্তিকে নিয়োগ দিতে পারছেন না? স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন একজন অত্যন্ত ভালো মানুষ। আওয়ামী লীগের একজন নিবেদিত নেত্রী। অন্য কোনো মন্ত্রকের দায়িত্ব পেলে তিনি হয়তো দক্ষতা ও যোগ্যতার পরিচয় দেবেন। কিন্তু একজন টাফ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হওয়ার ব্যাপারে তার মধ্যে যে দক্ষতা ও ব্যক্তিত্বের অভাব রয়েছে, প্রধানমন্ত্রী কি গত তিন বছরেও তা বুঝতে পারেননি?
সরকার যদি অনেক ভালো কাজের মধ্যে দুটি মন্দ কাজও করে, জনজীবনের প্রাত্যহিক দুর্ভোগ কমাতে ব্যর্থ হয়, তাহলে সমুদ্র জয় করেও জনগণের মন জয় করা যাবে না। সরকারের ছোট-বড় সকল ব্যর্থতারই সুযোগ নেবে বিরোধী দল। ইলিয়াস আলীর গুম হওয়া, সাগর-রুনির শয়নকক্ষে বসে নির্মম খুনের শিকার হওয়া ইত্যাদি ঘটনার ব্যাপারে সরকার যদি সামান্য সাফল্যেরও প্রমাণ দিতে পারত, তাহলে বিএনপি এগুলোকে ইস্যু করার এবং এ ইস্যু নিয়ে হরতালে নামার সুযোগ পেত না। দেশের মানুষ হরতাল পছন্দ করে না। কিন্তু বিএনপির ডাকা সাম্প্রতিক হরতালগুলো পছন্দ না করলেও তার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়নি। দাতা দেশগুলোর সরকারি নেতারা, দেশের ব্যবসায়ীরা হরতালের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন, দুই নেত্রীর মধ্যে সংলাপ-সমঝোতার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। কিন্তু এ ব্যাপারে 'পায়াস উইশ' ব্যক্ত করা ছাড়া আর কিছু করেননি। হিলারি ও প্রণব দু'জনেই ঢাকা এসেছিলেন বাংলাদেশের ওপর চাপ দিয়ে তাদের কিছু স্বার্থ আদায়ের জন্য। এ দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা তাদের স্বার্থ পূরণের সহায়ক। এ কথা তারা জানেন। এই রাজনৈতিক অস্থিরতা দূর করার ব্যাপারে তাই তারা কোনো সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করেন না।
যদি তারা তা করেন, তাহলে তাকে আমাদের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে হস্তক্ষেপ বলে কেউ কেউ অভিযোগ করতে পারতেন। কিন্তু এই হস্তক্ষেপ শুভ ফলপ্রসূ হতো। ১৯৪৭ সালে কংগ্রেস-মুসলিম লীগের বিরোধ মেটানোর ব্যাপারেও ব্রিটিশ সালিশি ও হস্তক্ষেপ কি মেনে নেওয়া হয়নি? বর্তমানে বাংলাদেশের রাজনীতি ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় এমন কোনো পর্যায় নেই, যেখানে বিদেশি হস্তক্ষেপ ও ডমিনেন্স দেখা যাবে না। তাতে আমাদের আপত্তি নেই। যত আপত্তি, দেশের বিপজ্জনক রাজনৈতিক অস্থিরতা দূর করার ব্যাপারে আন্তরিকভাবে ইচ্ছুক কোনো মিত্র বিদেশি রাষ্ট্র মধ্যস্থতা করতে এলে।
১৯৬৫ সালে যখন ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধ হয়, তখন যুদ্ধ থামানোর জন্য হস্তক্ষেপ করেছিল সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন। দু'দেশের নেতাদের তাসখন্দে আমন্ত্রণ জানিয়ে নিয়ে বৈঠকের ব্যবস্থা করা হয়েছিল এবং তাসখন্দ শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। এই চুক্তি উপমহাদেশে শান্তি ফিরিয়ে এনেছিল। সোভিয়েত ইউনিয়নের এই উদ্যোগকে তখন কেউ উপমহাদেশে সোভিয়েত ইউনিয়নের হস্তক্ষেপ আখ্যা দেয়নি। এমনকি পাকিস্তানের মুরবি্ব দেশ এবং বিভিন্ন সামরিক চুক্তির পার্টনার আমেরিকাও মস্কোর এই উদ্যোগে বাধা দেয়নি, বরং স্বাগত জানিয়েছে।
বাংলাদেশে এখন শক্তিশালী এলিট ক্লাস আছে। তাদের একটি সুশীল সমাজ আছে, পশ্চিমা দাতা দেশগুলোর সঙ্গে যাদের সম্পর্ক প্রকাশ্য পিরিতির। তাদের শক্তিশালী ইংরেজি, বাংলা মিডিয়া আছে। তারা কেন নিরপেক্ষতার ভান করে আওয়ামী লীগ-বিরোধিতায় তাদের সকল ভূমিকা সীমাবদ্ধ করে না রেখে প্রকৃত নিরপেক্ষ ভূমিকা গ্রহণ এবং জনমত সংগঠিত করে দুই দলের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি দ্বারা তাদের সংলাপে ও সমঝোতায় বসতে বাধ্য করেন না তা আমার ক্ষুদ্র বুদ্ধির অগম্য।
আমাদের নোবেল লরিয়েট ড. ইউনূস, ব্রিটিশ নাইট খেতাবধারী আবেদ সাহেবের আর্থ-সামাজিক স্ট্যান্ডিংও দেশে বিরাট। তারা কেন তাদের এই প্রভাব ও প্রতিপত্তিকে কাজে লাগিয়ে দেশের বৃহত্তর স্বার্থে দুই নেত্রীকে সংলাপে বসতে চাপ না দিয়ে বিদেশিদের কাছে গিয়ে আত্মসম্মান বিকিয়ে ধর্ণা দেন? বিএনপি যাতে আর হরতাল, ধর্মঘট দ্বারা দেশময় অরাজকতা সৃষ্টিতে না এগোয় এবং আওয়ামী লীগ সরকারও তাদের জনসমর্থন ও রাজনৈতিক শক্তির অনুপস্থিতিতে প্রশাসনের দমননীতির সাহায্যে বিরোধী দলকে মোকাবেলার জন্য হার্ডলাইনে না যায়, সে জন্য অন্যান্য গণতান্ত্রিক দল, বিভিন্ন পেশার নেতৃস্থানীয় মানুষ, মিডিয়া, পেশাজীবী সমিতি, প্রভাবশালী সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবীরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে দুটি প্রধান দলের ওপরই এমন চাপ সৃষ্টি করুন, যাতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারসহ সকল অমীমাংসিত সমস্যা মীমাংসার জন্য দুই নেত্রী, দুই দল অবিলম্বে সংলাপে বসতে বাধ্য হয়। শুধু সংলাপে নয়, একটি সমঝোতায় পেঁৗছতে বাধ্য হয়। এই সংলাপকে একটি সর্বদলীয় রূপ দেওয়ার জন্য একটি শক্তিশালী নাগরিক কমিটি দ্বারা অনতিবিলম্বে দেশে একটি গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করলে কেমন হয়?
বিএনপিকে বুঝতে হবে, বর্তমান জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে আন্দোলনের আরও কঠোর কর্মসূচি দিয়ে কোনো লাভ হবে না। এসব কর্মসূচি দ্বারা জনগণের জীবনে দুর্ভোগ বাড়ানো যাবে, সরকারের পতন ঘটানো যাবে না। তাদের আন্দোলনের পেছনে জনসমর্থনও আদৌ শক্তিশালী নয়। সাধারণ মানুষ বর্তমান সরকারের ওপর ক্ষুব্ধ ও বিরক্ত। কিন্তু বিএনপির সদ্য অতীতের দুঃশাসনের তিক্ত অভিজ্ঞতা এখনও তারা ভোলেনি। সরকার হটাও আন্দোলনে তাদের সায় নেই।
অন্যদিকে বিরোধী দলের বিরুদ্ধে হার্ডলাইনে গিয়ে সরকার নিজেদের জনবিচ্ছিন্নতা বাড়ানো ছাড়া আর কোনো লাভেরই অধিকারী হবে না। সবচেয়ে বড় কথা, কোনো গণতান্ত্রিক সরকার যখন রাজনৈতিক শক্তি দ্বারা বিরোধী পক্ষকে মোকাবেলা করার বদলে ক্ষমতার লাঠি দ্বারা তাদের দমন করতে চায়, তখনই বুঝতে হবে তারা দুর্বল হয়ে পড়েছেন। তারা এখন একটি উইক গভর্নমেন্ট, মোটেই স্ট্রং গভর্নমেন্ট নয়। অতীতে বিএনপি সরকার এ ধরনের হার্ডলাইন ও দমননীতি দ্বারা ক্ষমতায় থাকতে পারেনি। বরং তাদের পতন ত্বরান্বিত হয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকার যেন তাদের নীতি অনুসরণ করে একই পরিণতির দিকে দ্রুত ধাবমান না হয়।
লন্ডন, শুক্রবার ১৮ মে, ২০১২

বৃহস্পতিবার, ১৭ মে, ২০১২

ভারতীয় গণতন্ত্রে ফাটল এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর বিপদাশঙ্কা



লেখক: আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী 
আমাকে এক সময় ভারত-প্রেমিক বলা হতো। যারা আমার লেখা বা আমাকে পছন্দ করেন না, তারা বলতেন, ‘ভারতের দালাল’। বিশেষ করে পাকিস্তানপন্থীরাই আমাকে এই গালিটা দিতেন। আমি তাতে কখনো দুঃখবোধ করিনি। কারণ, আমি তো একজন নগণ্য সাংবাদিক। পাকিস্তানের শাসক এবং তাদের অনুসারী ও অনুগৃহীত ব্যক্তিরা শেরে বাংলা ফজলুল হক, শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মওলানা ভাসানীর মতো সর্বজন শ্রদ্ধেয় জননেতাদের পর্যন্ত ‘ভারতের দালাল’, ‘হিন্দুদের দালাল’, ইত্যাদি বলে গালি দিত। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় যার অবদান সবচাইতে বেশি, সেই শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে পর্যন্ত পাকিস্তানের প্রথম প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী করাচির জাহাঙ্গীর পার্কের জনসভায় দাঁড়িয়ে গালি দিয়েছিলেন, ‘ভারতের লেলিয়ে দেওয়া পাগলা কুত্তা’ (a mad dog let loose by India)।
পাকিস্তান আমলে তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমানে বাংলাদেশ) যেসব বাঙালি নেতা গণতন্ত্র, বাঙালির স্বায়ত্তশাসন এবং ভাষা সংস্কৃতির অধিকারের পক্ষে কথা বলতেন, তাদেরই ঢালাওভাবে ভারতের দালাল আখ্যা দেওয়া হতো। ড. শহীদুল্লাহর মতো বিদ্বান মনীষীরা এই গালি থেকে অব্যাহতি পাননি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে তো ছয় দফা দাবির মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানের অধিকার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করায় রাষ্ট্রদ্রোহী এবং ভারতের সঙ্গে যোগসাজশে পূর্ব পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টার অভিযোগে ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায়’ আসামি করা হয়েছিল।
অর্থাত্ পাকিস্তান আমলে যারাই গণতন্ত্র, সেক্যুলার জাতীয়তা, জাতিগত ভাষা সংস্কৃতির অধিকার ও অর্থনৈতিক সমঅংশীদারিত্বের দাবি তুলেছেন, তাদেরই ‘ভারতের দালাল’, ‘হিন্দুদের দালাল’ ইত্যাদি বলে গালি দেওয়া হয়েছে এবং নানাভাবে নির্যাতন করা হয়েছে। অতীতের এই ঘটনাগুলোর কথা এজন্যেই উল্লেখ করলাম যে, পাকিস্তানে যারা গণতন্ত্র, নাগরিক অধিকার ও সেক্যুলার জাতিসত্তার কথা বলতেন, তারা ভারতের দালাল ছিলেন না, তবে অনেকেই ভারতের প্রতি অনুরাগ পোষণ করতেন, দেশটির গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি শ্রদ্ধাবোধের জন্য। তাছাড়া নেহেরু সরকার থেকে ইন্দিরা সরকার পর্যন্ত ভারতের যে সাম্রাজ্যবাদ ও ঔপনিবেশিকতা-বিরোধী দৃঢ় ভূমিকা ছিল, তা এশিয়ার সদ্য স্বাধীন দেশগুলোর জন্য ছিল অনুপ্রেরণার উত্স।
ব্রিটেনের ওয়েস্টমিন্স্টার ডেমোক্রেসি যেমন এক সময় সারাবিশ্বে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার মডেল হয়ে দাঁড়িয়েছিল, ভারতীয় গণতন্ত্রও তেমনি দ্বিতীয় মহাযুদ্ধোত্তর সদ্য স্বাধীন দেশগুলোর জন্য একটি মডেল হয়ে দাঁড়াবে।
এটা ছিল অনেকেরই আশা। আমার মতো নগণ্য একজন সাংবাদিকও ভারতের প্রতি অনুরাগ পোষণ করতাম, তা এই ভারতীয় গণতন্ত্রের জন্য। ভারতের জাতির জনক মহাত্মা গান্ধী সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে দৃঢ় ভূমিকা নিয়ে আত্মদান করেছেন, নেহেরু আমেরিকার নব্য সাম্রাজ্যবাদী সামরিক চুক্তির ফাঁদে পা দেননি; (যে ফাঁদে পা দিয়ে পাকিস্তান আজ ন্যাটোর প্রাত্যহিক ড্রোন হামলায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হচ্ছে), নেহেরু কন্যা ইন্দিরা বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামে অকুতোভয়ে সাহায্য দিয়েছেন, সোয়া কোটি বাংলাদেশি শরণার্থীকে ভারতে আশ্রয় দিয়ে দশ মাসের বেশি খাইয়েছেন, পরিয়েছেন এবং সর্বোপরি বাংলাদেশের স্বাধীনতার যুদ্ধে ১৮ হাজার ভারতীয় সৈন্য আত্মাহুতি দিয়েছে, এসব কারণে বাংলাদেশে অসংখ্য দেশপ্রেমিক মানুষের মতো ভারতের প্রতি অকৃত্রিম বন্ধুত্বের মনোভাব আমার মনেও গড়ে উঠতে দেরি হয়নি।
একই কারণে পাকিস্তানের প্রতি আমার ছিল বীতরাগ। একটি ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র, যা এ যুগে অচল ও অবাস্তব, জন্ম থেকেই যে রাষ্ট্রে ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা কার্যত সমান নাগরিক অধিকার বঞ্চিত এবং নিগৃহীত; যে রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা ‘কায়েদে আজম’ মুখে গণতন্ত্রের কথা বললেও কাজে ডিকটেটরসুলভ মনোভাব নিয়ে একটি ধর্মীয় ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র কাঠামো তৈরির সূচনা করে গেছেন, সেই দেশটি আজ অর্ধ তালিবান রাষ্ট্রে পরিণত হয়ে মিত্র আমেরিকার অকুপাইড দেশ এবং মিত্রের বোমা হামলায় ধ্বংসের পথে।
উপমহাদেশে ব্রিটিশ শাসনের অবসানের পর গণতন্ত্রবিহীন পাকিস্তানের পশ্চাত্গতি এবং গণতান্ত্রিক ভারতের অগ্রগতি শেষোক্ত দেশটির প্রতিই আমাদের অনুরাগ বৃদ্ধি করেছে। ভারত আমাদের বিরাট প্রতিবেশী দেশ হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশের নাগরিক হিসাবে আমরা আশা করেছি, পাকিস্তানের শাসন ও শোষণ থেকে মুক্ত হওয়ার পর স্বাধীন বাংলাদেশ নেহেরুর সমাজতান্ত্রিক ধাঁচের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামো অনুসরণে একটি সেক্যুলার ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে উঠবে। আমাদের সে আশা অবশ্য পূর্ণ হয়নি।
এখন ভাবতেও শিউরে উঠি, আমরা যদি এখনো পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত পূর্ব পাকিস্তান থাকতাম, তাহলে বর্তমানে পাকিস্তানে যা ঘটছে, তার অংশভাগী আমাদেরও হতে হতো। ঢাকা এবং অন্যান্য শহরেও ন্যাটোর ড্রোন হামলা চলতে থাকলে বিস্ময়ের কিছু ছিলো না। আমাদের মুক্তিযুদ্ধ আমাদের বাঁচিয়েছে। এখনো পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত থাকলে সেখানকার মৌলবাদী সন্ত্রাসের ঢেউ এখানেও পূর্ণভাবে ছড়াতো এবং তা দমনের নামে ন্যাটোর তত্পরতা পূর্ব পাকিস্তানেও ধ্বংসযজ্ঞ সৃষ্টি করতো।
পাকিস্তানের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়েও আমরা সম্পূর্ণ বাঁচতে পারিনি। বাংলাদেশের আইএসআইয়ের তত্পরতা জামায়াত এবং আরো কয়েকটি সন্ত্রাসী মৌলবাদী দলের সঙ্গে যুক্ত হয়ে এখানেও মৌলবাদী উত্থান ঘটানোর চেষ্টা করেছে। আমাদের ভাগ্য ভালো বিশ্ব পরিস্থিতির আকস্মিক পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশেও আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সেক্যুলার শক্তি নির্বাচনে জিতে (২০০৮) ক্ষমতায় বসতে পেরেছে এবং সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদী শক্তিকে আপাতত রুখে দিতে পেরেছে। তাতেও সন্ত্রাসী মৌলবাদী ও সাম্প্রদায়িক চক্র সম্পূর্ণ পরাজিত হয়নি। তাদের পেছনেও আন্তর্জাতিক মদদ আছে। সেই মদদের জোরে এখনও তারা কখনো ধর্ম, কখনো গণতন্ত্র ইত্যাদির ছদ্মবেশে সারা বাংলাদেশে অস্থিরতা ও অরাজকতা সৃষ্টিতে ব্যস্ত। এ সময় বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ও সেক্যুলার রাজনীতির একটি বড় ভরসা ছিলো পাশের বড় প্রতিবেশী গণতান্ত্রিক ভারত। শুধু বাংলাদেশ নয়, এশিয়া এবং আফ্রিকারও অনেক সদ্য স্বাধীন দেশ আশা করেছে তাদের নতুন এবং দুর্বল গণতন্ত্র যাতে বাইরের বা ভেতরের ষড়যন্ত্রে ভেঙে না পড়ে, সেজন্যে ভারতীয় গণতন্ত্র তাদের মাথার উপর ছাতার মতো (Protactive Umbrella) থাকবে। যতোদিন নেহেরু ও ইন্দিরা গান্ধী বেঁচে ছিলেন এবং ভারতে শাসন ব্যবস্থায় গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের কর্তৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ ছিলো, ততোদিন ভারত তার এই ভূমিকা যে একেবারে পালন করেনি তা নয়। ভারত স্বাধীন হওয়ার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ইন্দোনেশিয়ায় সুকর্ণের নেতৃত্বে ‘মারদেকা’ বা তাদের স্বাধীনতার যুদ্ধ শুরু হয়। এই স্বাধীনতার যুদ্ধ দমন করার জন্য ডাচ সাম্রাজ্যবাদীরা চেয়েছিল ভারতের আকাশ সীমা ব্যবহার করে ইন্দোনেশিয়ায় বিমান হামলা চালাতে। নেহেরু তখনো শক্ত হয়ে ক্ষমতায় বসেননি। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে ভারতের আকাশ সীমা দিয়ে ডাচদের সকল বিমান চলাচল বন্ধ করে দিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে মিয়ানমারে সামরিক বাহিনী ক্ষমতা দখল করলে ভারত তার তীব্র প্রতিবাদ করেছে এবং এই সেদিন পর্যন্ত মিয়ানমারের সামরিক শাসন-বিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সাহায্য জুগিয়েছে। সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত গেরিলাদের ভারতে আশ্রয় দিয়েছে এবং তাদের ট্রেনিং দানও করেছে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের ইন্দিরা সরকারের সর্বাত্মক সাহায্য ও সমর্থন দানের কথাতো আর নতুন করে লেখার দরকার নেই। এখানেই ভারতের পাশাপাশি নয়াচীনের ভূমিকার কথাও আসে। ভারত স্বাধীনতা লাভ করে ১৯৪৭ সালে। তার দেড় কি দু’বছর পরেই মার্কিন তাবেদার চিয়াং কাইশেক সরকারকে ক্ষমতা থেকে উচ্ছেদ করে চীনে কমুনিস্ট শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর একমাত্র প্রথম কোরিয়া যুদ্ধে জড়িত হওয়া ছাড়া কোনো প্রতিবেশী দেশে গণতন্ত্র রক্ষা বা সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন রোধে নয়া চীনকে কোনো ভূমিকা গ্রহণ করতে দেখা যায়নি। চীন নিজেই কম্যুনিস্ট রাষ্ট্র। ফলে তার কাছ থেকে গণতন্ত্র রক্ষায় তেমন সাহায্য পাওয়ার আশা হয়তো অনেক দেশই করেনি। কিন্তু বিভিন্ন দেশে সাম্রাজ্যবাদী নয়া আগ্রাসন রোধে চীন তাদের পাশে দাঁড়াবে। যেমন দাঁড়িয়েছিল সাবেক সোভিয়েট ইউনিয়ন, এই আশা অনেকেই করেছে।
কিন্তু নয়াচীন নিজের রাষ্ট্রীয় স্বার্থ ছাড়া অন্য কোনো প্রকার নীতি ও আদর্শকে কোনো প্রকার গুরুত্ব দেয়নি। তার তিব্বত গ্রাস, ভিয়েতনামের মুক্তিযুদ্ধের শত্রুতা, ভারতের সঙ্গে সীমান্ত-বিরোধকে আকস্মিক সশস্ত্র অভিযানে পরিণত করা, কম্বোডিয়ায় গণহত্যাকারী লনলন রেজিমকে সাহায্য দান, পাকিস্তানের সামরিক জান্তার পৃষ্ঠপোষক সাজা, সাবেক সোভিয়েট ইউনিয়নকে কোণঠাসা করার জন্য মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে আঁতাত, জোট নিরপেক্ষ মুভমেন্টে যোগ না দেওয়া, সর্বোপরি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা এবং পাকিস্তানের বর্বর গণহত্যাযজ্ঞে সহায়তাদান, সদ্য স্বাধীন এশিয়ান ও আফ্রিকান দেশগুলোর অনেকগুলোতে বিশ্ব-রাজনীতিতে নয়াচীনের ভূমিকা সম্পর্কে সন্দেহ ও ভীতি সৃষ্টি করেছিলো।
চীন বর্তমানে যতোই সামরিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে শক্তিশালী হচ্ছে, ততোই আগের আন্তর্জাতিক নীতি অনেকটাই সংশোধন করেছে। কিন্তু সম্প্রসারণবাদী নীতি থেকে সে সরে এসেছে এটা কেউ মনে করতে পারছে না। এখানেই এশিয়া ও আফ্রিকায় মার্কিন আধিপত্যবাদী নীতির সঙ্গে নয়াচীনের সম্প্রসারণবাদী নীতির সাম্প্রতিক বিরোধ এবং ভারত সেখানে আমেরিকার পক্ষপুটে আশ্রয় নিয়ে অর্থনৈতিক ও সামরিক সম্প্রসারণবাদী নীতিতে চীনের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চাইছে। আমেরিকা চাইছে এই বিরোধ উস্কে দিয়ে চীনকে ভারতের দ্বারা শায়েস্তা করতে এবং নিজে তার সাফল্য লুটে নিতে। যেমন সে করেছে চীনের সঙ্গে সাবেক সোভিয়েট ইউনিয়নের বিরোধ উস্কে দিয়ে এবং চীনকে সাহায্য-সমর্থন দিয়ে সোভিয়েট ইউনিয়নকে পর্যুদস্ত করার বেলায়। সোভিয়েট ইউনিয়নকে পর্যুদস্ত করার পর আমেরিকার এখন নজর পড়েছে নয়াচীনকে শায়েস্তা করার উপর। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের এই ধূর্ত খেলার ফাঁদে ভারত আগে কখনো পা দেয়নি। ষাটের দশকে হিমালয়ান যুদ্ধে চীনের দ্বারা অবমানিত ও পর্যুদস্ত হওয়া সত্ত্বেও নেহেরুর আত্মমর্যাদাশীল রাজনৈতিক নেতৃত্ব দৃঢ়তার সঙ্গে আমেরিকার ফাঁদে পা দিতে রাজি হয়নি। তখনকার মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন কেনেডি ভারতকে ভয় দেখিয়েছিলেন, চীন আবার ভারতের বিরুদ্ধে পূর্ণ যুদ্ধ (Total war) শুরু করবে। সুতরাং ভারতের উচিত, আমেরিকার সামরিক বলয়ে যোগ দেওয়া। আমেরিকা তাহলে ভারতকে তার ‘আণবিক ছাতার’ (atomic umbralla) নিচে সুরক্ষা দেবে। নেহেরু ঘৃণার সঙ্গে সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। বলেছিলেন, একটি স্বাধীন জাতি হিসেবে প্রয়োজনে চীনের সঙ্গে যুদ্ধ করে মরবো, কিন্তু সাম্রাজ্যবাদের কোলে আশ্রয় নেব না।
ভাগ্যের পরিহাস, পঞ্চাশ বছর আগে ভারতের কংগ্রেস সরকারের আত্মগর্বী রাজনৈতিক নেহেরু-নেতৃত্ব আমেরিকার যে পারমাণবিক সহযোগিতা গ্রহণে দৃঢ়তার সঙ্গে অস্বীকার করেছিলেন, ৫০ বছর পর যখন ভারত এশিয়ার দ্বিতীয় সুপার পাওয়ারে পরিণত হতে চলেছে, তখন দিল্লির সেই কংগ্রেস সরকারেরই অরাজনৈতিক নেতৃত্ব (সোনিয়া-মনমোহন সরকার) পরমাণু শক্তি সহযোগিতার নামে আমেরিকার বর্তমান আগ্রাসী আধিপত্যবাদী নীতির সঙ্গে কণ্ঠি বদলে আগ্রহী।
চীন, ব্রাজিল, ইরান, কিউবা প্রভৃতি দেশের সঙ্গে হাত মিলিয়ে আজ ভারতের যেখানে ধ্বংসাত্মক ভয়াবহ মারণাস্ত্র শক্তির অধিকারী আমেরিকার নিউ ওয়ার্ল্ড অর্ডার নামক সর্বগ্রাসী আধিপত্যবাদী নীতির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা উচিত ছিলো (যেমন পঞ্চাশের দশকে নেহেরু গড়ে তুলেছিলেন মিসরের নাসের, যুগোশ্লোভিয়ার টিটোর সঙ্গে হাত মিলিয়ে জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন তৈরি করে), সেখানে চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতার নামে সারা এশিয়ার দুয়ার দিল্লি খুলে দিচ্ছে নেহেরু-নীতি বিসর্জন দিয়ে মার্কিন আধিপত্যবাদী নীতির সামরিক অভিযানের মুখে। ফলে গণতন্ত্রের জন্য ভয়াবহ বিপদ সৃষ্টি হয়েছে সারা এশিয়ায়। এমনকি ভারতেও। মিত্রবেশী আমেরিকার ক্রম অনুপ্রবেশে ভারতীয় গণতন্ত্রের দেয়ালেও ফাটল সৃষ্টি হয়েছে এবং বিপদাশঙ্কা দেখা দিয়েছে বাংলাদেশসহ সকল প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্যও।
বাংলাদেশে আমরা  যারা এতোকাল ‘ভারত-প্রেমিক’ বলে পরিচিত ছিলাম, এমনকি ‘ভারতের দালাল’ বলেও গালি সহ্য করেছি, তাদেরও ভারতের বর্তমান রাজনৈতিক গতি-প্রকৃতি, বিগ বিজনেসের কাছে কংগ্রেসের রাজনৈতিক নেতৃত্বের আত্মসমর্থন, ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন নীতিকে সমর্থন, আফগানিস্তানে মার্কিন সমর-নীতিতে (শান্তি প্রতিষ্ঠার নামে) সহযোগিতা, বাংলাদেশসহ প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সমস্যা মেটাতে অনিচ্ছা ও অনাগ্রহ, সর্বোপরি মার্কিন মদদে গুজরাটে নরেন মোদী, পশ্চিমবঙ্গে মমতা ব্যানার্জি, মধ্য ভারতে আন্না হাজারের মতো যে অপশক্তি গণহিতৈষীর ছদ্মবেশে আত্মপ্রকাশ করছে, তা মোকাবিলায় ভারতীয় গণতন্ত্রের দুর্বলতা শঙ্কিত করে তুলছে। (পরবর্তী অংশ আগামী রবিবার)।
++লন্ডন থেকে ১৭ মে বৃহস্পতিবার, ২০১২

বুধবার, ১৬ মে, ২০১২

খালদো জয়িার কণ্ঠে এখনও এত প্রলাপোক্তি কনে?




আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী


মানুষ কখন প্রলাপ করতে শুরু করে সাধারণত র্বাধক্য, মতভ্রিম, গভীর শোক ও হতাশা থকেওে মানুষ অনকে সময় প্রলাপ বক।ে মনোচকিৎিসকরো বলনে, গভীর হতাশা ও শোক যুক্ত হলে মানুষ যকেোন বয়স,ে যে কোন অবস্থায় প্রলাপ বকা শুরু করতে পার।ে বএিনপি নত্রেী খালদো জয়িার সাম্প্রতকি কথার্বাতা শুনে মনে হয় তাঁর অধকিাংশই প্রলাপোক্তি ছাড়া আর কছিু নয়। কন্তিু তনিি কনে প্রলাপ করনে? এখনও এত তাঁর তমেন বয়স হয়ন।ি র্বাধক্যরে জরা তাঁকে তমেন র্স্পশ করনে।ি তনিি এখনও ‘সাজুগুজু বগেম।’ এই অবস্থায় তাঁর মুখে এখন অনবরত প্রলাপোক্তি কনে?
অবশ্য বচোল ও বাচাল কথা তনিি আগওে বলছেনে। যমেন ‘পাগল ও শশিু ছাড়া কউে নরিপক্ষে হয় না।’ কংিবা ‘আওয়ামী লীগ নর্বিাচনে জয়ী হলে মসজদিে উলুধ্বনি শোনা যাব’ে ইত্যাদ।ি তনিি ‘স্বশক্ষিতি।’ ফলে তার শক্ষিতি পরার্মশদাতাদরে শখোনো বুলি আওড়াতে গয়িে তনিি যে রাজনতৈকি অপরপিক্বতার পরচিয় দয়িছেনে, তাকে অনকেে প্রলাপরে র্পযায়ে টানতে চানন।ি হালে এই মহলিা যসেব কথা বলতে শুরু করছেনে, তা যে একবোরইে প্রলাপোক্ত,ি তা বুঝতে একজন বালকরেও কষ্ট হয় না।
খালদো জয়িা তো বাংলাদশেে ক্ষমতা দখলকারী সনোপতরি স্ত্রী হওয়ার সুবাদে হঠাৎ গজয়িে ওঠা রাজনতৈকি নত্রেী। কন্তিু বশ্বিরে যারা সরো এবং প্রকৃত রাজনীতবিদি, তারাও অতবিৃদ্ধ বয়সে প্রলাপ বকছেনে। যমেন ব্রটিনেরে র্চাচলি এবং আমরেকিার রগিান। র্চাচলি শষে বয়সে শষেবাররে মতো ব্রটিনেরে প্রধানমন্ত্রী পদে বসে এমন একটি দায়ত্বিহীন কথা বলছেলিনে, যাকে প্রলাপোক্তি আখ্যা দয়িে টোরি র্পাটি তাঁকে প্রধানমন্ত্রীর পদ থকেে সরয়িে এন্থনি হডনেকে সইে পদে বসাতে বাধ্য হয়ছেলি। রগিান-উপাখ্যান আরও লজ্জাকর। ‘ইরা-গটে’ কলেঙ্কোররি পর থকেে র্বাধক্যজনতি রোগ যুক্ত হয়ে তনিি প্রলাপ বকতে শুরু করনে। লখোটি র্দীঘ হয়ে যাবে এই ভয়ে সে কাহনিী এখানে টানছি না।
বাংলাদশেে খালদো জয়িার বয়স এখনও তমেন হয়ন।ি তনিি কোন জটলি রোগওে আক্রান্ত নন। দলে তাঁর নতেৃত্বকে এই মুর্হূতে চ্যালঞ্জে জানানোরও কোন হম্মিতওয়ালা পুরুষ নইে। ব্যারস্টিার মওদুদ থকেে শুরু করে চোখা ময়িা পুত্র মর্জিা ফখরুল সকলে অষ্টপ্রহর তাঁর সামনে আভূমি নত হয়ে থাকনে। তাহলে ইদানীং তার এই প্রলাপ বকা শুরু করা কনে? সম্প্রতি আমি যখন ঢাকায় কয়কেদনিরে জন্য অবস্থান করছলিাম, তখন বএিনপরি এক নতো আমাকে বলছেনে, ‘খালদো জয়িা এখন বাইরে যতোই র্তজন-র্গজন করুন, ভতেরে ভতেরে তনিি একবোরইে ভঙেে পড়া একজন হতাশ মানুষ। ক্যান্টনমন্টেরে এত প্রয়ি বাড়টিি তাঁর হাতছাড়া হয়ে যাব,ে এটা কোনদনি তনিি ভাবনেন।ি তার পর তাঁর ‘নয়নরে মণ’ি তারকে, কোকো ও নাতনিাতনদিরে র্দীঘ অর্দশন ও বদিশেে অনর্দিষ্টিকালরে স্বচ্ছো নর্বিাসন তাকে অধীর ও পাগল করে তুলছে।ে র্বতমান আওয়ামী লীগ সরকাররে দ্রুত জনপ্রয়িতা হ্রাস পাওয়া সত্ত্বওে আগামী সাধারণ নর্বিাচনে জতিে তনিি আবার ক্ষমতায় যাবনে, মুখে যা-ই বলুন, মনে মনে সইে আশা তনিি পোষণ করছনে না। তনিি হতাশার গভীরে ডুবে আছনে।
হতে পারে তনিি হতাশা সাগরে নমিজ্জতি। তাই তাঁর কণ্ঠরে আগরে বচোল কথাগুলো এখন প্রলাপে পরণিত হয়ছে।ে প্রশ্ন হলো, র্মাকনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হলিারি ক্লনিটনরে সাম্প্রতকি ঢাকা সফররে সময় তাঁর সঙ্গে র্দীঘক্ষণরে বঠৈক এবং ভারতরে র্অথমন্ত্রী প্রণব মুর্খাজরি তাঁকে আশ্বাস দয়িে বলা বাংলাদশেরে কোন দলরে বন্ধু ভারত নয়,’ র্অথাৎ তারা বএিনপরি বন্ধু, এসবও কি খালদো জয়িার মনরে পুঞ্জীভূত হতাশা দূর করতে টনকিরে কাজ করনে?ি নাকি তার শক্তি ও সর্মথনরে আসল উৎস ক্যান্টনমন্টেে তাঁর অবস্থান র্দুবল হওয়ায় এবং পাকস্তিানরে সামরকি গোয়ন্দো সংস্থা আইএসআই ক্রমশ র্দুবল হতে থাকায় হলিার-িপ্রণবরে সঞ্জীবনী সুধাও তাঁর হতাশা দূর করতে টনকিরে কাজ করছে না? ইলয়িাস আলীর অপহরণরে মতো ঘটনা থকেওে তনিি কি অশনি সঙ্কতে পয়েছেনে, তনিইি তা জাননে।
সম্প্রতি ঢাকার অদূরে গাজীপুরে বগেম খালদো জয়িা তাঁর বক্তৃতায় যে কথা বলছেনে, তাঁকে প্রলাপোক্তি বললে কম করে বলা হয়। তনিি বলছেনে, ‘আগামী ৪২ বছরওে আওয়ামী লীগ আর ক্ষমতায় আসবে না। তাদরে পথে পথে ঘুরতে হব।ে’ এ ধরনরে কথা তনিি আগওে বলছেনে, তবে বছর উল্লখে করে এত স্পসেফিকিলি বলনেন।ি তা এত প্রলাপোক্তরি মতো শোনায়ন।ি ক্ষমতায় বসে বহুবার তনিি বলছেনে, ‘আওয়ামী লীগ আর ক্ষমতায় আসবে না।’ এটা ছলি একটা বাতকে বাত্। কউে তমেন গুরুত্বরে সঙ্গে নয়েন।ি কথাটা গুরুত্বও পায়ন।ি কারণ, তারপর আওয়ামী লীগ বরিাট সংখ্যাগরষ্ঠিতা নয়িে নর্বিাচনে জতিছেে এবং ক্ষমতায় এসছে।ে তাছাড়া আওয়ামী লীগ আর ক্ষমতায় আসবে না, তনিি তার রাজনতৈকি অপরপিক্বতা থকেে একথা বললওে জনগণ তা বশ্বিাস করনে।ি কারণ, বহুদলীয় গণতন্ত্ররে প্রক্রয়িাই হলো, জনগণরে ইচ্ছানুযায়ী ক্ষমতার হাত বদল। আর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আছ,ে কাল থাকবে না। বএিনপি আসব।ে আবার জনগণরে ইচ্ছানুযায়ী বএিনপি চলে যাব,ে আওয়ামী লীগ আসব।ে বহুদলীয় গণতন্ত্ররে চাকা এভাবইে চলতে থাক।ে খালদো জয়িা না চাইলওে সটো এভাবইে ঘুরতে থাকবে এবং ঘুরছ।ে
কন্তিু এখন খালদো জয়িা একবোরে সন তারখি দয়িে যে কথাটা বলছনে, এটা প্রলাপোক্তি হলওে এর ভতের দয়িে তাঁর মনরে ইচ্ছাটা প্রকাশ পাচ্ছ।ে 
৪২ বছর আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আর আসতে পারবে না। র্অথাৎ আসতে দয়ো হবে না। তাহলে ক্ষমতায় থাকবে ক?ে বএিনপি এবং খালদো জয়িা? তাহলে তো বাংলাদশেে একদলীয় শাসন চালু হব।ে খালদো জয়িা কি সটোই চান? তাহলে আর বাকশালপন্থীদরে উঠত-েবসতে গালি দয়ো কনে? গণতন্ত্ররে জন্য এত মায়াকান্না কনে? মুখ ফুটে তনিি সে কথাটা বললইে পারনে! তাহলে দখো যতে তাঁর এই প্রলাপোক্তরি প্রতক্রিয়িা দশেরে মানুষরে মধ্যে কী ঘট?ে 
গাজীপুরে দয়ো খালদো জয়িার বক্তব্য শুনে আমার মনে প্রশ্ন জগেছে,ে চরিকালরে জন্য আওয়ামী লীগরে ক্ষমতায় আসা বন্ধ না করে তনিি ৪২ বছর সময়সীমা নর্ধিারণ করে কনে দলিনে? নাকি এটা গাণতিকি (গধঃযসধঃরপধষ) হসিাবরে ভুল। শুনছে,ি ‘স্বশক্ষিতি’ বগেম জয়িা স্কুলে গণতি পরীক্ষায় পাস করতনে না। ফলে গাণতিকি হসিাবে তাঁর ভুল হতে পার।ে নজিরে র্বতমান বয়স হসিাব করলে তনিি দখেতনে, তাঁর র্বতমান বয়স ষাট হলে ৪২ বছর পর তাঁর বয়স দাঁড়াবে একশ’ দুই। এদ্দনি তনিি ডক্টিটেরি শাসন চালাবার জন্য বঁেচে কি থাকবনে? মসিররে মোবারক এবং লবিয়িার গাদ্দাফরি ডক্টিটেরি শাসনও ৪০ বছর অতক্রিম করতে পারনে।ি ক্ষমতার উত্তরাধকিারী হসিাবে তারা যে সন্তানদরে মনোনীত করছেলিনে, তাদরে কউে আজ মৃত, কউে পলাতক।
খালদো জয়িা কি আশা করনে, আগামী নর্বিাচনে জতিে তনিি ৪২ বছররে জন্য ক্ষমতাসীন হবনে এবং এই ফাঁকে তারকে রহমানকে এক্সকিউিটভি ক্ষমতার বলে র্দুনীতি সন্ত্রাসরে সকল মামলা মোকদ্দমা ও দ- থকেে মুক্ত করে দশেে এনে বাতস্তিার পুত্ররে মতো ক্ষমতায় বসাবনে এবং নজিে তাঁর মাথার ওপর ছাতার মতো থাকবনে? ধন্য আশো কুহকনিী! এই ৪২ বছর সময়ে র্বতমানে যৌবনরে শষে প্রান্তে উন্নীত তারকেরে বয়স দাঁড়াবে কতো? তারকেরে অবস্থা এখনই ব্রটিনেরে যুবরাজ প্রন্সি র্চালসরে মতো। রানীর র্দীঘ জীবন লাভরে ফলে র্চালসরে নয়, তাঁর পুত্র উইলয়িামরে সংিহাসনে বসার সম্ভাবনা বাড়ছ।ে 
বাংলাদশেে খালদো জয়িা ‘সোনার পুত্র’ তারকেকে সংিহাসন ছড়েে দতিে চাইল,ে তাতে বসা কি তাঁর জন্য নষ্কিণ্টক হব?ে সামনে নর্বিাচন আছে না! তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রশ্নে বএিনপি যদি নর্বিাচনে না যায়, তাহলে ৪২ বছররে ময়োদটি শুরু হবে কব?ে আর নর্বিাচনে যোগ দয়িে জয়ী হয়ে যদি ক্ষমতাতওে যায়, তাহলওে তারকেকে সংিহাসনে বসানো কি সহজ হব?ে আগরে সইে বএিনপি এখন নইে। ইলয়িাস-অপহরণ কী সঙ্কতে দচ্ছি?ে অবশ্যই তারকেকে সংিহাসনে বসানো সহজ হবে না। তারকেরে দুই শক্তশিালী বাহু (লন্ডনরে কমরুদ্দীন মৃত, ইলয়িাস আলী অপহৃত) এখন অনুপস্থতি। তারকে এখন দশেে ফরিতে চাইলে কোথায় যাবনে আগ,ে কারাগার,ে না ক্ষমতার সঁিড়তি?ে দলীয় ঐক্য তখন কি আর র্বতমানরে বাইররে ঠাঁট বজায় রাখতে পারব?ে মুসলমি লীগরে কাউন্সলি ও কনভনেশন এই দুই ভাগরে তো দু’ভাগ হয়ে যতেে পার।ে এমন কি আগামী নর্বিাচনরে আগইে।
তারকেরে জন্য তো বড় সমস্যা ক্যান্টনমন্টে। দশেে থাকাকালে ক্যান্টনমন্টেে বাস করে তারকে যভোবে সনো অফসিারদরে মাথায় ছড়ি ঘুরয়িছে,ে তাদরে নয়িোগ বদলি নয়িে যথচ্ছোর করছে,ে তাতে সনো অফসিারদরে বৃহত্তর অংশে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা আর আছে ক?ি তাকে তো আওয়ামী লীগ সরকার দশেছাড়া করনে।ি করছেে সনো সর্মথতি এক এগারোর সরকার। আওয়ামী লীগ বাধা না দলিওে তারকে রহমান এখন দশেে ফরিতে পারবনে ক?ি সে সাহস তার কোথায়? আর এখনই দশেে না ফরিলে মায়রে স্নহে সম্বল করে কি রাজনীততিে টকিে থাকা যাব?ে এখনই শোনা যাচ্ছ,ে তারকেরে ওপর আশা হারয়িে জামায়াত ও আইএসআই নতুন নতো খুঁজছ।ে ইলয়িাস আলীর অপহরণরে সঙ্গে এই খােঁজাখুঁজরি কোন সর্ম্পক আছে কি না, সে প্রশ্নও কোন কোন মহলে দখো দয়িছে।ে
আর বাংলাদশেে আরও ৪২ বছর ডক্টিটেরি শাসন চালানোর জন্য বএিনপি টকিে থাকবে এটা যারা আশা কর,ে তারা আহাম্মকরে বহেস্তেে বাস করছ।ে পাকস্তিান র্অজন করছেে যে মুসলমি লীগ, সে দলটি পাকস্তিান প্রতষ্ঠিার পর ১০ বছর অস্তত্বি টকিয়িে রাখতে পারনে।ি আর বাংলাদশেে পারবে সইে দলরে ঔরসে জন্ম নয়ো বএিনপ?ি শুধু টকিে থাকার জন্যই কোন রাজনতৈকি দলরে ভারতরে কংগ্রসেরে মতো যে জনসম্পৃক্ততা ও গণভত্তিি থাকা দরকার, তা বএিনপরি কোথায়? সনো ছাউনতিে এক ক্ষমতালোলুপ সনোপতরি র্স্বাথে যে দলরে জন্ম, সনো ছাউনরি সর্মথন যত কমছ,ে ততই তার আয়ু কমে আসছ।ে কোন নীতি ও আর্দশ ছাড়া এলটি শ্রণেীর কছিু সুযোগসন্ধানী রাজনীতকি এবং সাবকে কছিুসংখ্যক সভিলি ও মলিটিারি অফসিার নয়িে গঠতি দল টকিে থাকতে পারে না। বএিনপি যে এখনও টকিে আছে তার কারণ, জাতীয় ও আর্ন্তজাতকি ঘোলাটে পরস্থিতিতিে টকিে থাকার সুযোগ গ্রহণ এবং ষড়যন্ত্র, ক্যু রাজনতৈকি হত্যা প্রভৃতরি দ্বারা এবং পরর্বতীকালে গণতন্ত্ররে ছদ্মবশেে ক্ষমতায় বসার সুযোগ পাওয়া। র্মাকনি র্দুবুদ্ধতিে বশ্বিময় যে সন্ত্রাসী মৌলবাদরে অভ্যুত্থান ঘটছে,ে তারও সুযোগ নয়িছেে বএিনপ।ি
কন্তিু বশ্বি পরস্থিতিি এখন দ্রুত বদলাচ্ছ।ে উপমহাদশেরে আইএসআইয়রে শক্তি দ্রুত হ্রাস পাচ্ছ।ে বাংলাদশেে মৌলবাদী সন্ত্রাস এবং জামায়াত কোণঠাসা। বএিনপরি আঁচলে জামায়াত এখন আশ্রতি। তাতে জামায়াত বাঁচবে না এবং বএিনপওি আওয়ামী লীগ সরকাররে অদক্ষতা ও ভুলভ্রান্তরি দরুন সাময়কি নর্বিাচনী সাফল্য র্অজন করতে থাকলওে র্দীঘ ময়োদে তার অস্তত্বি বপিন্ন হব।ে সামরকি ক্যু ঘটানোর পরবিশে ও পরস্থিতিি এখন নইে। সভিলি এলটি ক্লাসরে সুযোগসন্ধানী অংশ এবং বদিশেী পৃষ্ঠপোষতি বসেরকারী উন্নয়ন সংস্থার একাংশকে নয়িে (যমেন ড. ইউনূস এবং ব্র্যাকরে স্যার আবদে) গণতান্ত্রকি রাজনতৈকি ব্যবস্থায় বকিল্প অগণতান্ত্রকি রাষ্ট্র ব্যবস্থা গড়ে তোলার চক্রান্ত চলছ।ে তাতে আওয়ামী লীগরে ক্ষতি হতে পার,ে বএিনপরি লাভ হবে না। ৪২ বছর যাবত আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় যাওয়া ঠকেয়িে রাখা যাব,ে এটা বএিনপরি দবিাস্বপ্ন ছাড়া আর কছিু নয়। 
প্রলাপোক্তি দ্বারা মনরে হতাশা গভীর হতাশা দূর করার চষ্টো করা চল,ে কন্তিু মনরে গোপন অথবা প্রকাশ্য কোন আশাই র্পূণ করা যায় না। গাজীপুরে দয়ো খালদো জয়িার বক্তব্যও তাই প্রলাপোক্তি ছাড়া আর কছিু নয়। এই প্রলাপোক্তরি মধ্যে স্বরৈাচারী গোপন ইচ্ছার প্রকাশটাই প্রবল, গণতন্ত্ররে সঠকি পথে অবস্থানরে ইচ্ছাটা নয়। আসলইে বগেম জয়িা গণতান্ত্রকি চরত্রিরে কোন নতো কী?

রবিবার, ১৩ মে, ২০১২

বাংলাদেশে প্রণব বাবুর প্রমোদভ্রমণ (?)






আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী
আমাদের সর্বজনীন প্রণব দাদা সম্প্রতি বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন। তিনি অবশ্য রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনতে এসেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের সার্ধজš§শত বার্ষিকীর সমাপ্তি অনুষ্ঠান ছিল ঢাকায়। এই অনুষ্ঠানে রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনে খুশি হয়েই কিনা জানি না, তিনি বাংলাদেশকে কিছু বকশিশ দেয়ার ঘোষণা দিয়ে গেছেন। এই বকশিশটা হল, প্রণব বাবুর পূর্ব ঘোষিত ভারত কর্তৃক বাংলাদেশকে দেয়া ১০০ কোটি ডলারের ঋণ চুক্তিতে বড় রকমের ছাড় দেয়া। তাতে বাংলাদেশের মিডিয়ায় ধন্য ধন্য রব ওঠা উচিত ছিল। তা ওঠেনি। কেউ কেউ বলেছেন, আগে প্রতিশ্র“তিটা পালিত হোক। না আঁচালে বিশ্বাস নেই।
প্রণব মুখার্জি ভারতের অর্থমন্ত্রী হলেও বাংলাদেশের মানুষের কাছে ’৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকে বিশেষভাবে পরিচিত। তখন তিনি যুবক ছিলেন। তবু মুক্তিযুদ্ধের অনেক তর“ণ নেতার কাছে দাদা ছিলেন। সেই তর“ণরা এখন প্রবীণ হয়েছেন। প্রণব বাবু হয়েছেন আরও প্রবীণ। তাই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দলটির অধিকাংশ নেতার কাছেই তিনি প্রণব দা। আরও অনেকের কাছে তিনি সর্বজনীনভাবে প্রণব দাদা হয়ে উঠেছেন। অধুনা এই দাদাগিরি মাঝে মাঝেই বাংলাদেশের ওপর ফলান। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে কোন সমস্যা দেখা দিলেই তিনি ঢাকায় ছুটে আসেন। তার ঝুড়িতে থাকে প্রতিশ্র“তির অষ্টরম্ভা। সেই রম্ভা দেখিয়ে তিনি বাংলাদেশকে শান্ত করেন। দিল্লি স্বার্থ রক্ষা করেন। এবারও তাই করেছেন কিনা তা আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই বোঝা যাবে। তিনি বাংলার বন্ধু নামে পরিচিত। আসলে কি তাই?
প্রণব বাবুর সঙ্গে (মুক্তিযুদ্ধকালে ও ’৭৫ সালে তার ভূমিকার জন্য) হাসিনা-পরিবার ও আওয়ামী লীগ নেতাদের একটা বিশেষ সম্পর্ক আছে। সে সম্পর্কের জোরে তিনি অনেক সময় এমন সব কাজ করেন, যা তার কূটনৈতিক এখতিয়ারের বাইরে। সদ্য অতীতে একবার তিনি ঢাকায় এসে শেখ হাসিনার না-পছন্দের চার কি তিনজন প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতার সঙ্গে (যারা মন্ত্রিসভায় ¯’ান পাননি) ঢাকার ভারতীয় দূতাবাসে বৈঠক করেন। যেমন এবার করেছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন ঢাকায় এসে দুটি উন্নয়ন সং¯’ার দু’জন প্রধানের সঙ্গে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাসে তাদের ডেকে এনে। দু’প্রধানই আমেরিকা ও ব্রিটেন দ্বারা বিরাটভাবে পুরস্কৃত। প্রণব বাবু ঢাকায় এসে আওয়ামী লীগের যে ক’জন প্রবীণ নেতার সঙ্গে বৈঠক করেছেন, তারাও তাকে দাদা ডাকেন। এই ভাইপোদের সঙ্গে দাদার কী কথাবার্তা হয়েছে, তা সঠিকভাবে জানা যায়নি। শেখ হাসিনাও এই বৈঠকের কথা আগে কি জানতেন, না তাকে পরে জানানো হয়েছে? আমার সন্দেহ আছে। 
প্রণব বাবু বাংলাদেশের অনেক রাজনীতিকের কাছে দাদা হলেও তিনি তখনও ভারতের একজন মন্ত্রী। তিনি ঢাকায় এলে একজন বিদেশি মন্ত্রীর কূটনৈতিক শিষ্টাচার মেনে চলতে হবে। এটা ওয়াশিংটনে মেনে চলে না, দিল্লিও নয়। প্রণব বাবু সেবার ঢাকায় এসে আওয়ামী লীগের একদল অসš‘ষ্ট নেতার সঙ্গে আলাদাভাবে কথা বলবেন কিনা সে সম্পর্কে শেখ হাসিনার সম্মতি চেয়েছিলেন কি? না, দাদাগিরির জোর দেখিয়েছেন আমি তা জানি না।
ঢাকায় এসে প্রণব বাবুর এই দেখা-সাক্ষাৎ সম্পর্কে কলকাতার কাগজে এক সাংবাদিক তখন লিখেছিলেন, ‘প্রণব বাবু ভারতের মন্ত্রী হিসেবে নয়, বাংলাদেশেরÑ বিশেষ করে আওয়ামী লীগের একজন পুরনো বন্ধু ও শুভাকাক্সক্ষী হিসেবে আওয়ামী লীগের অসš‘ষ্ট নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। তিনি সম্ভবত শেখ হাসিনার সঙ্গে তাদের দূরত্ব কমাতে চেয়েছেন।’ কলকাতার সাংবাদিকের এই যুক্তিটা মেনে নেয়া যেত। এটা সত্য, সেই একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকে মুক্তিযুদ্ধে সাহায্যদাতা ভারতের বিশেষ করে কংগ্রেস দলের সঙ্গে আওয়ামী লীগের মধ্যে একটা বিশেষ সম্পর্ক স্বাভাবিকভাবেই গড়ে উঠেছিল। 
কিš‘ কথা হল, সেই সম্পর্কটি কি এখনও আছে? থাকলে প্রণব বাবু এবার ঢাকা সফরে এসে বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গিয়ে কী করে বলেন, তারা বাংলাদেশের কোন দলের বন্ধু নন। হঠাৎ প্রণব বাবুর এই ভোল ও বুলি পাল্টাল কেন? তাহলে তিনি কি বুঝতে পেরেছেন, বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের দিনকাল ভালো নয়? আর এই বুঝ থেকেই সম্পর্কের লগিটা আগেই বদলানোর চেষ্টা করছেন? পশ্চিমবঙ্গের গত রাজ্য নির্বাচনের সময় কলকাতার একটি পত্রিকা লিখেছিল, ‘ভোল পাল্টানোর ব্যাপারে বুড়ো প্রণবের কোন জুড়ি নেই, এ কথা এখন সিপিএম তথা বামফ্রন্ট জানে। মমতাও জানেন।’
পশ্চিমবঙ্গে যখন বামফ্রন্টের রাজত্ব, তখন প্রণব বাবুকে দিল্লি রাজ্য কংগ্রেসের সভাপতি পদে বসিয়ে রেখেছিল। তাতে পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেসের লুপ্ত প্রভাব-প্রতিপত্তি এক কণা ফিরিয়ে আনা যায়নি। কিš‘ বামফ্রন্টের সঙ্গে কংগ্রেসের মৈত্রী বজায় রাখার স্বার্থে দিল্লির শাসক কংগ্রেস প্রণব বাবুকে ব্যবহার করেছে। প্রণব বাবু তখন বামফ্রন্টের ঘোর সমর্থক এবং মমতা ও তৃণমূলের ঘোর বিরোধী। প্রণব বাবু নির্বাচনে জেতেন না। কিš‘ গত সাধারণ নির্বাচনে বামফ্রন্টের সৌজন্যে কংগ্রেসের টিকিটে নির্বাচনে জেতেন এবং মন্ত্রী হন। সেবার তার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার কথা ছিল। কিš‘ দিল্লির অবাঙালি শাসক কোটারি একজন বাঙালি, যিনি কংগ্রেসের সবচেয়ে প্রবীণ নেতা তাকে এতকাল শুধু ব্যবহার করেছে, কিš‘ ক্ষমতায় বসাতে চায়নি। তাই তাকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী করে তার মাথার ওপরে এককালে তারই অধীন¯’ এক সাবেক ব্যুরোক্রেট মনমোহন সিংকে প্রধানমন্ত্রী পদে বসিয়ে দেয়া হয়েছিল। তার প্রতিবাদ করার ব্যক্তিত্ব আমাদের প্রণব দাদার ছিল না।
এখন শোনা যা”েছ, ভারতের রাষ্ট্রপতি পদে মিসেস প্রতিভা পাতিলের মেয়াদ শেষ হলে প্রণব বাবুকে ওই পদে বসানো হবে। এটা হবে তার জন্য সান্ত্বনা পুরস্কার। তাকে ক্ষমতাধর প্রধানমন্ত্রী পদে না বসিয়ে ক্ষমতাহীন রাষ্ট্রপতি পদে কিক আপ করা হবে। এক ভারতীয় সাংবাদিকের মতে, এটা হবে ভারতের রাষ্ট্রপতি পদে জেন্ডার পরিবর্তন মাত্র।
প্রণব দাদার আগের কথায় ফিরে যাই। পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কংগ্রেসের সভাপতি থাকাকালেও প্রণব বাবু পশ্চিমবঙ্গের স্বার্থ দেখেননি। দেখেছেন দিল্লির স্বার্থ। ফলে রাজ্য ও রাজ্য-রাজনীতিতে তার প্রভাব খুবই ক্ষীণ। তিনি সুবিধাবাদী। যখনই দেখেছেন পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্টের রসাতলগামী দশা এবং দিল্লি মমতা ও তৃণমূলের সঙ্গে মিতালি পাতাতে আগ্রহী, অমনি তিনি বামফ্রন্টবিরোধী এবং মমতাবান্ধব হয়ে ওঠেন। মমতার কাছ থেকে তার এই ভোল পাল্টানোর একটা দামও তিনি আদায় করেছেন।
আগে বামফ্রন্টের সমর্থন ও সাহায্যে তিনি কেন্দ্রে নির্বাচিত হয়েছেন। গত রাজ্য নির্বাচনে মমতার সাহায্য ও সমর্থনে তার পুত্রকে রাজ্য বিধানসভায় বিধায়ক নির্বাচিত করে এনেছেন। প্রতিদানে মমতা ব্যানার্জি হয়তো ভেবেছিলেন, কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী হিসেবে এবং নিজে একজন বাঙালি হিসেবে প্রণব বাবু দিল্লির কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে অবহেলিত পশ্চিমবঙ্গের ন্যায়সঙ্গত আর্থিক দাবি-দাওয়া আদায়ে সাহায্য জোগাবেন। এখন দেখা যা”েছ, সে আশায় গুড়ে বালি। পশ্চিমবঙ্গের স্বার্থের চেয়ে দিল্লির সেবা করা ও স্বার্থরক্ষাই প্রণব বাবুর ধ্যান-জ্ঞান। তার নাকের ডগায় রাষ্ট্রপতির পদটি মুলোর মতো ঝোলানো রয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই মমতা-প্রণব বিরোধও এখন ধীরে ধীরে জমে উঠেছে।
সম্প্রতি বাংলাদেশে এসে প্রণব বাবু যে বলেছেন, ‘তারা বাংলাদেশের কোন দলের বন্ধু নন’ এ কথাটা বাতকে বাত বা বাংলাদেশের বিরোধী দলকে খুশি করার জন্য একটি কূটনৈতিক চাল, তা ভাবলে ভুল করা হবে। এটা চালিয়াতি নয়, ভোল পাল্টানোর সূচনা বলে অনেকের সন্দেহ। এমনকি কলকাতার কোন কোন সাংবাদিকেরও এই ধারণা। তাদের কথা হল, রাষ্ট্র হিসেবে অবশ্যই ভারত তার প্রতিবেশী বাংলাদেশের কোন বিশেষ দলের বন্ধু হবে না। হবে যে দলই ক্ষমতায় আসুক, তাদের বন্ধু। কিš‘ তাই বলে একই আদর্শে বিশ্বাসী দুই দেশের দুটি দলের মধ্যে স্পেশাল রিলেশন্স বা বিশেষ সম্পর্ক কি গড়ে উঠতে পারে না? দীর্ঘকাল ধরে ব্রিটেনের কনজারভেটিভ পার্টি ও আমেরিকার রিপাবলিকান পার্টির মধ্যে কি বিশেষ সম্পর্ক ছিল না? যে জন্য প্রেসিডেন্ট পদে ডেমোক্র্যাট দলের প্রার্থী ক্লিনটনকে হারানোর জন্য ব্রিটেনের তখনকার কনজারভেটিভ প্রধানমন্ত্রী জন মেজর সাহায্য জুগিয়েছিলেন।
বাংলাদেশ ও ভারতেও আওয়ামী লীগ ও কংগ্রেসের মধ্যে একটা বিশেষ সম্পর্ক ছিল, এখনও থাকা উচিত। এই সম্পর্কের ভিত্তি দুই দলের একই আদর্শÑ গণতন্ত্র এবং ধর্মনিরপেক্ষতা। বিএনপি এই আদর্শে বিশ্বাসী নয়। প্রণব বাবু এই দুই দলের মধ্যে কী করে ইকুয়েশন টানেন? বাংলাদেশে বিএনপি ক্ষমতায় এলে আন্তর্জাতিক নিয়ম-কানুন অনুযায়ী অবশ্যই ভারত সেই সরকারকে সহযোগিতা দেবে। তাই বলে তারা আওয়ামী লীগের সঙ্গে আদর্শিক বিশেষ সম্পর্কের কথা অস্বীকার করবে? কই, এই বিশেষ সম্পর্কের কথা ব্রিটেনের কনজারভেটিভ পার্টি ও আমেরিকার রিপাবলিকান পার্টি কিংবা আমেরিকার ডেমোক্র্যাট পার্টি ও ব্রিটেনের লেবার পার্টি তো এখনও অস্বীকার করে না। যদিও এ সম্পর্ক এখন আগের মতো নেই।
আসলে ভারতের শাসক দল হিসেবে কংগ্রেসেরও চরিত্রের পরিবর্তন হয়েছে। নেহের“ ও ইন্দিরার কংগ্রেস আর নেই। সোনিয়া-মনমোহনের কংগ্রেস মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বন্ধু, গণতন্ত্র ও সেক্যুলারিজমে তাদের আ¯’া কম। এশিয়ায় গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ রাজনৈতিক দল ও দেশগুলোর প্রতিও তাদের সমর্থন ও সহযোগিতা এখন অতীতের বিষয়। সে জন্যই মিয়ানমারে চীনের প্রভাব বিস্তার রোধের জন্য দিল্লি সে দেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সমর্থন প্রত্যাহার করে দৌড়ে গিয়ে সামরিক জান্তার বন্ধু হতে পেরেছে। ভারতের রাজনীতিও এখন বিগ বিজনেসের কব্জায়। তাদের স্বার্থে বাংলাদেশেও গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতাবিরোধী রাজনৈতিক শক্তির প্রতি সমর্থন দানে দিল্লির কংগ্রেস সরকার যে দ্বিধা করছে না, প্রণব বাবুর ঢাকা-উক্তি তারই আভাস দেয়। এটা বাতকে বাত বলে উড়িয়ে দেয়া যায় না।
বাংলাদেশে হাসিনা সরকার ক্ষমতায় এসেছে আজ তিন বছরের বেশি হয়ে গেছে। এই তিন বছর গণতন্ত্রবিরোধী শক্তিশালী চক্রগুলোর বির“দ্ধে লড়াই করে অস্তিত্ব রক্ষার জন্য এ সরকারকে কী প্রাণান্ত চেষ্টা করতে হ”েছ, তা কি প্রণব বাবুরা জানেন না? সেই বিডিআর বিদ্রোহ থেকে সাম্প্রতিক ইলিয়াস আলী অপহরণ পর্যন্ত একটার পর একটা ষড়যন্ত্র দ্বারা সারাদেশে অ¯ি’র অব¯’া সৃষ্টি করা হয়েছে। উদ্দেশ্য, বর্তমান সরকারকে উৎখাত করা, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বানচাল করা, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া বন্ধ করা। এ সত্যটি প্রণব বাবুরা জানেন না? তারা চতুর্দিক থেকে চক্রান্তবেষ্টিত বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক সরকারকে রক্ষায় সাহায্যদানের পরিবর্তে গঙ্গার পানি, তিস্তার পানি, টিপাইমুখ বাঁধ, সীমান্তে অব্যাহত হত্যাকাণ্ড, ভারতীয় ভিসা প্রদানে বাংলাদেশীদের অহেতুক হয়রানি ইত্যাদি নানা সমস্যা জিইয়ে রেখে মুখে মৈত্রী ও সহযোগিতার লম্বা লম্বা বুলি আওড়া”েছন। মৈত্রীর আড়ালে তাদের আধিপত্যবাদী ভূমিকাটিই প্রধান। আর সেই ভূমিকা সফল করার জন্য প্রণব বাবু বার বার বাংলাদেশে আসেন। বাংলাদেশের বন্ধু সেজে আসেন।
এবারও তিনি দিল্লির উদ্দেশ্য পূর্ণ করতেই এসেছিলেন। সেই সঙ্গে সঙ্গীত-শ্রবণ ও প্রমোদভ্রমণ। ১০০ কোটি ডলার ঋণ চুক্তিতে তিনি যে বড় ছাড় দেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন, তা এখনও প্রতিশ্র“তি। বাস্তবায়ন কবে হবে তা আমাদের জানা নেই। তিস্তার পানি, টিপাইমুখ বাঁধ নিয়ে তিনি যেসব কথা বলেছেন, তা অতীতের অসার প্রতিশ্র“তির পুনরাবৃত্তি। আর ১০০ কোটি ডলারের ঋণ চুক্তিতে তিনি যে বড় ছাড় দেয়ার 
ঘোষণা দিয়েছেন, তা কতটা আসল এবং কতটা শুভঙ্করের ফাঁকি, তা নিয়ে অদূর ভবিষ্যতে একটি আলাদা নিবন্ধে আলোচনার আশা রাখি।
লন্ডন, ১৩ মে রবিবার ।। ২০১২

শনিবার, ১২ মে, ২০১২

হিলারি ঢাকা থেকে কলকাতায় ছুটে গেলেন কেন?


আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী
মমতা উচ্চাকাঙ্ক্ষী হবেন না কেন? মনমোহন সিংকে তিনি থোড়াই কেয়ার করেন। অন্য অঙ্গরাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীদেরসহ মনমোহন ঢাকা এসেছেন। মমতা আসেননি। সাফ না বলে দিয়েছেন। দিলি্ল বাংলাদেশের সঙ্গে তিস্তার পানি চুক্তি করতে চাইলে কী হবে, মমতা রাজি নন। তিনি এখনই ভারতের প্রধানমন্ত্রী না হলে কী হবে? তিনি ভারতের ফুয়েরার। পশ্চিমবঙ্গে তার সাবেক সমর্থকদের কেউ কেউ এখন বলছেন, তার চরিত্রে সব রকম ফ্যাসিবাদী প্রবণতা বর্তমান

হিলারি ও প্রণব প্রায় একই সময়ে ঢাকায় এসেছিলেন। আবার প্রায় একই সময় চলে গেছেন। তারা একই উদ্দেশ্যে ঢাকায় এসেছিলেন কি-না এখনই বোঝা যাবে না। কিন্তু এই উদ্দেশ্য নিয়ে ঢাকা-দিলি্ল-কলকাতা ও ওয়াশিংটনে নানারকম কথাবার্তা চলছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন যেদিন ঢাকা আসেন (৫ মে, শনিবার) সেদিন সকালে আমি ঢাকা ত্যাগ করেছি। বিমানবন্দরে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা দেখেছি। দু'একটি স্পাই ডগও বিমানবন্দরে ঘোরাফেরা করেছে।
হিলারি ও প্রণব মুখার্জির যুক্ত ঢাকা আগমনে নানা সমস্যায় জর্জরিত হাসিনা সরকার কি একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন? মনে হয় না। প্রথম হাসিনা সরকারের আমলে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন ঢাকা সফরে এসে সরকারি দলের নেত্রীর চেয়েও বিরোধী দলের নেত্রীর সঙ্গে বৈঠকে যেমন অধিক সময় দিতে চেয়েছেন, তেমনি তার স্ত্রী হিলারি পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে ঢাকায় এসে বিরোধী দলের নেত্রীর সঙ্গে বৈঠক করার ব্যাপারে সরকারি দলের নেত্রীর চেয়ে অধিক গুরুত্ব না দিলেও সমান গুরুত্ব দিয়েছেন। তাছাড়া দু'জন পশ্চিমা পুরস্কারপ্রাপ্ত (নোবেল পুরস্কার ও স্যার খেতাব) এনজিও-প্রধানের সঙ্গে তিনি বৈঠক করেছেন। সম্ভবত এই বৈঠকের গুরুত্বই বেশি। এই দুই ব্যক্তিকেই পশ্চিমা শক্তি কর্তৃক প্রশংসিত ও অনুগৃহীত দুই 'নেটিভ প্রিন্স' বলা চলে। ব্রিটিশ ভারতে ব্রিটিশ রাজপুরুষ বা ভাইসরয়ের দরবারে এই নেটিভ প্রিন্সদের গুরুত্বই ছিল বেশি। কলোনিয়াল শাসকদের প্রতি তাদের আনুগত্য ছিল প্রশ্নাতীত।
অন্যদিকে ভারতের অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখার্জিও এবার ঢাকা সফরে এসে বলে গেছেন, 'দিলি্ল বাংলাদেশের কোনো দলের নয়, বাংলাদেশেরই বন্ধু।' হঠাৎ ঢাকা এসে গায়ে পড়ে এ কথাটা বলার তাৎপর্য কী তাও বোঝা মুশকিল। হিলারি ঢাকা থেকে সরাসরি কলকাতায় গেছেন। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে দেখা করেছেন। উদ্দেশ্যটা কি? ওয়াশিংটনের কায়কারবার দিলি্লর সঙ্গে। সেখানে দিলি্লকে এড়িয়ে ভারতের একটি অঙ্গরাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক কেন? তাতে দিলি্ল একটু অস্বস্তিতে পড়েছে। কিন্তু এই অস্বস্তিটা প্রকাশ করতে পারছে না। তবে দিলি্লর একটি কাগজ বলেছে, 'হিলারির কলকাতা সফর ঘোড়া ডিঙিয়ে ঘাস খাওয়া।' মমতা সম্ভবত ব্যাপারটা বুঝেছেন, তাই প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংকে জানিয়েছেন, 'আমি তো হিলারির সঙ্গে দেখা করতে চাইনি। তিনিই দেখা করতে এসেছেন।'
কোনো কোনো সংবাদ সূত্র বলেছে, মমতাকে হিলারি বাংলাদেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠার পরামর্শ দিয়েছেন। এই পরামর্শ দেওয়ার জন্য তো একটি সুপার পাওয়ারের প্রতিনিধির আরেকটি দেশের অঙ্গরাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর কাছে ছুটে যাওয়ার দরকার ছিল না। ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মারফত মমতাকে পরামর্শটা জানালেই চলত। এ জন্যই কলকাতায় বাম রাজনৈতিক মহল হিলারি-মমতার বৈঠককে সন্দেহের চোখে দেখছে। বলছে, 'ডালমে কুছ কালা হায়।'
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হালের হাবভাব দেখলে মনে হয়, তিনি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর পদ নয়, একেবারে দিলি্লর মসনদ দখল করে ফেলেছেন। একজন ভারতীয় সাংবাদিক ঢাকার 'ইন্ডিপেন্ডেন্ট' কাগজে লিখেছেন, 'দিলি্লতে কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী থাকাকালে মমতার দৃষ্টি ছিল কলকাতার দিকে। এখন কলকাতায় মুখ্যমন্ত্রীর পদটি দখল করার পর তার দৃষ্টি দিলি্লর দিকে। টার্গেট প্রধানমন্ত্রীর পদ।' আমার সন্দেহ, এই লক্ষ্য অর্জনে মমতাকে কিছু 'সদুপদেশ' দেওয়ার জন্যই মিসেস হিলারি ক্লিনটনের এই কলকাতায় ছুটে যাওয়া কি-না! পশ্চিমবঙ্গে বাম শাসন উৎখাতে মমতার তৃণমূল কংগ্রেস অবশ্যই জনসমর্থন পেয়েছে। কিন্তু এই জনসমর্থন সংগঠনে কারা তার পেছনে শক্তি জুগিয়েছে তা এখন ধীরে ধীরে উন্মোচিত হচ্ছে।
কলকাতার একজন অ-বাম সাংবাদিক বন্ধুই আমাকে বলেছেন, 'বিদেশি বৃহৎ পুঁজির বড় ধরনের গোপন সাহায্য না থাকলে সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রামের যুদ্ধে মমতা ভারতের দেশীয় পুঁজির সম্রাট টাটা, বিড়লাদের হারাতে পারতেন না। কলকাতার প্রগতি শিবিরের বুদ্ধিজীবীদের একটা বড় অংশও বিভ্রান্ত হয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গের সিপিএম নেতা বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের সবচেয়ে বড় 'বুদ্ধুত্ব' ছিল এই যে, পশ্চিমবঙ্গের গত রাজ্য নির্বাচনের আগে তিনি কাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমেছেন, তা বুঝতে পারেননি।'
ভারতের এই অ-বাম সাংবাদিকের মতো দিলি্লর সোনিয়া-মনমোহন সরকারও হয়তো এত দিনে মার্কিন-মৈত্রীর মাহাত্ম্য বুঝতে পারছেন। এই মৈত্রীর মাহাত্ম্য হলো এক হাত থাকবে গলায়, অন্য হাত থাকবে পিঠের পেছনে ছুরি ধরে। চীনকে যখন আমেরিকা তার সবচেয়ে 'ভধাড়ঁৎবফ ঃৎধফব ঢ়ধৎঃহবৎ' (সবচেয়ে প্রিয় বাণিজ্যিক বন্ধু) বলে প্রচার চালাচ্ছে, চীনের সঙ্গে আকাশ ও নৌ যুক্ত সামরিক মহড়া চালাচ্ছে, ঠিক তার পাশাপাশি চলেছে তিয়েনআনমেনের মতো অভ্যুত্থান ঘটিয়ে চীনের রাজনৈতিক ব্যবস্থা ধ্বংসের চক্রান্ত। এই চক্রান্ত চীন ঠেকাতে পেরেছে তার রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক শক্তির জোরে।
চীনের অনুকরণে ভারতের বর্তমান কংগ্রেস সরকারও চেয়েছে, আমেরিকার সঙ্গে গলাগলি করে এশিয়ায় চীনের সমকক্ষ সুপার পাওয়ার হতে। এই আশায় নেহরুর নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতি বর্জন, দেশের বাম সহযোগীদের দূরে সরিয়ে দিয়ে মনমোহন সিং দৌড়ে গিয়ে 'আমেরিকার ইতিহাসের নিকৃষ্টতম প্রেসিডেন্ট' জর্জ বুশের সঙ্গে আলিঙ্গনাবদ্ধ হয়েছিলেন, পরমাণু সহযোগিতা চুক্তি করেছিলেন। মার্কিন সহায়তায় আত্মগর্বে স্ফীত ভারত ভেবেছে, তারা চীনের সমকক্ষ কিংবা তার চেয়েও বড় সুপার পাওয়ার হয়ে গেছে। এই গর্বেই সম্প্রতি ভারত যে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্রটি আকাশে উৎক্ষেপণ করেছে, সেটি সম্পর্কে বলা হচ্ছে, 'এই মিসাইল চীনের যে কোনো স্থানে আঘাত হানতে সক্ষম।'
দিলি্লর পাগড়িধারী শাসকরা যে সত্যটি অনুধাবন করেননি তা হলো, সামরিক শক্তির দ্বারা কোনো দেশ টিকতে পারে না, যদি তার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা মজবুত না হয়। এই দুই ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছিল বলেই সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন সুপার পাওয়ার হওয়া সত্ত্বেও টিকে থাকতে পারেনি। ভারতের রাজনৈতিক ব্যবস্থা (কেন্দ্রীয় সরকারসহ) বর্তমানে যেমন স্থিতিহীনতার মুখে, তেমনি অর্থনৈতিক ব্যবস্থাও দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার জন্য আশানুরূপ শক্তিশালী নয়। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় এই দুর্বলতার সুযোগে মনমোহন সরকারের ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করে মার্কিন আনুগত্যের কাছে নতজানু করার জন্য আন্না হাজারে ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সৃষ্টি। চীনের তিয়েনআনমেনের মতো ভারতেও আন্না হাজারে দ্বারা একটি পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টা করা হয়েছিল। চীনে স্লোগান তোলা হয়েছিল, মুক্ত চিন্তা, নাগরিক অধিকার। ভারতে স্লোগান তোলা হয়েছিল, দুর্নীতি উচ্ছেদ। দুটিই জনপ্রিয় স্লোগান। চীন সরকার কঠোরতার সঙ্গে তিয়েনআনমেন বিদ্রোহ দমন করেছে। ভারতে মনমোহন সরকার আমেরিকার চাপের কাছে আরও নমনীয় হয়ে আপাতত আত্মরক্ষা করেছে।
অর্থনৈতিক ফ্রন্টে আন্না হাজারে, রাজনৈতিক ফ্রন্টে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মনমোহন সরকার তথা ভারতের দুর্বল কেন্দ্রীয় গণতান্ত্রিক সরকারের জন্য দুটি বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছিল। এখন মমতার চ্যালেঞ্জটিই বড়। দিলি্ল মমতার তৃণমূলের সমর্থনের ওপর নির্ভরশীল। উত্তর প্রদেশের সাম্প্রতিক নির্বাচনে দেখা গেছে, রাহুল গান্ধীর ক্যারিশমা উপকথা মাত্র। ভারতের ভাবী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। মমতা উচ্চাকাঙ্ক্ষী হবেন না কেন? মনমোহন সিংকে তিনি থোড়াই কেয়ার করেন। অন্য অঙ্গরাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীদেরসহ মনমোহন ঢাকা এসেছেন। মমতা আসেননি। সাফ না বলে দিয়েছেন। দিলি্ল বাংলাদেশের সঙ্গে তিস্তার পানি চুক্তি করতে চাইলে কী হবে, মমতা রাজি নন। তিনি এখনই ভারতের প্রধানমন্ত্রী না হলে কী হবে? তিনি ভারতের ফুয়েরার। পশ্চিমবঙ্গে তার সাবেক সমর্থকদের কেউ কেউ এখন বলছেন, তার চরিত্রে সব রকম ফ্যাসিবাদী প্রবণতা বর্তমান। এই মমতার কাছে আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ছুটে না গেলে আর কে যাবেন? এর বিরাট রাজনৈতিক তাৎপর্য বুঝতে দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের আরও কিছুটা সময় লাগবে।
এবার আসি বাংলাদেশের কথায়। বাংলাদেশে হিলারির এটা স্বেচ্ছা সফর। যতদূর জানি, বাংলাদেশ সরকারের আমন্ত্রণে তার এই সফর নয়। হাসিনা সরকারের সংকট মোচনে সাহায্য দিতে তিনি এসেছিলেন, তা ভাবার কোনো সঙ্গত কারণ নেই। ঢাকার সরকারি মহলের কারও কারও সঙ্গে আলাপ করে জেনেছি, আমেরিকার ইচ্ছাপূরণে হাসিনা সরকারের ওপর আরও চাপ সৃষ্টির জন্য তিনি এসেছিলেন। এর মধ্যে আফগানিস্তানে তথাকথিত শান্তিরক্ষা প্রচেষ্টায় বাংলাদেশকে জড়ানো এবং একজন নেটিভ প্রিন্সকে একটি ব্যাংকে পুনর্বাসনের ইস্যুটি তো ছিলই। সবচেয়ে বড় কথা, অবনতিশীল বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক এবং সে ক্ষেত্রে চীনের অবস্থানের কথাটি হিলারির জানা। আমেরিকা এ ব্যাপারে উদ্বিগ্ন। এই উদ্বেগ দূর করার জন্যই হয়তো প্রায় একই সঙ্গে প্রণব মুখার্জির ঢাকা আগমন এবং আবার ১০০ কোটি ডলারের ঋণ-সাহায্য প্রকল্পে আরও বড় ছাড় দেওয়ার গালভরা প্রতিশ্রুতি ঘোষণা।
যদি হাসিনা সরকার গোঁ ধরে, দেশের স্বার্থবিরোধী সব মার্কিন চুক্তি ও শর্ত মেনে চলতে অনিচ্ছা অথবা অক্ষমতা দেখায়, তাহলে বিএনপি এবং খালেদা জিয়া তো রয়েছেনই। এই দলের সঙ্গেও সরকারি দলের মতো সমান গুরুত্ব দিয়ে বৈঠক করে আওয়ামী লীগ সরকারকে জানিয়ে দেওয়া হলো, আগামী নির্বাচনে মার্কিন সমর্থন বর্তমান সরকারের জন্য সুনিশ্চিত নয়। প্রণব মুখার্জিও বলেছেন সে কথা, বাংলাদেশের কোনো একটি দলের বন্ধু ভারত নয়।
আমার মতে, হিলারির ঢাকা সফরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, নেটিভ প্রিন্সদের সঙ্গে বৈঠক। সম্ভবত এই প্রিন্সদের সঙ্গেই তিনি সবচেয়ে মন খুলে কথা বলেছেন। সম্প্রতি এই প্রিন্সদের একজনকে পোল্যান্ডে কমিউনিস্ট শাসনের বিরুদ্ধে সিআইএর সাহায্যে যে অভ্যুত্থান ঘটানো হয়েছিল, তার নেতা লেস ওয়ালেসার সঙ্গে পাশাপাশি বসে ফটোসেশন করতে দেখা গেছে। ছবিটি দেশ-বিদেশের অনেক কাগজেই ছাপা হয়েছে। একজন সামান্য শ্রমিক নেতা লেস ওয়ালেসা রাতারাতি পোল্যান্ডে 'গণঅভ্যুত্থান' ঘটিয়ে কমিউনিস্ট শাসন উৎখাত করেছিলেন। তাকে পোল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট করা হয়েছিল এবং নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল। পরে জানাজানি হয়, ওয়ালেসা সিআইএর এজেন্ট এবং পোল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট পদ থেকে তিনি বিতাড়িত হন। বহুকাল পর তার ছবি কাগজে দেখলাম। আমাদের এক নেটিভ প্রিন্সের সঙ্গে।
এই নেটিভ প্রিন্সদের সঙ্গে আছে বাংলাদেশের একটি তথাকথিত সুশীল সমাজ। তাদের সহযোগী শক্তিশালী মিডিয়াও আছে। বাংলাদেশের আগামী সাধারণ নির্বাচনও প্রায় কাছাকাছি। বর্তমান সরকারের নানাবিধ ভুলভ্রান্তি এবং সমস্যা সমাধানে ব্যর্থতায় ২০০১ সালের নির্বাচন-পূর্ব চক্রান্তের রাজনীতির আভাস আবার পাওয়া যাচ্ছে। সেবার ক্লিনটন এসে পানি আরও ঘোলা করে গিয়েছিলেন। এবার হিলারি এসে কী করে গেলেন, তা স্পষ্ট হবে আরও কিছুদিন পর।
লন্ডন, ১১ মে, শুক্রবার, ২০১২

মঙ্গলবার, ৮ মে, ২০১২

“স্বদেশ স্বদেশ করিস তোরা, স্বদেশ তো আর তোদের নয়”


                             আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী

আটাশ দিন পর লন্ডনে ফিরে এসে ডাক্তারের কাছে গিয়েছি। আমরা তাদের বলি জিপি বা জেনারেল প্র্যাকটিসনার। তিনি মধ্যবয়সী সুশ্রী মহিলা বেশ মিস্টি হেসে কথা বলেন। আমাকে দেখেই হেসে বললেন, এবার বাংলাদেশ থেকে কি কি রোগ নিয়ে এসেছ? বললাম, ডায়েরিয়া এবং জ্বর। তিনি বললেন, প্রতিবারই তো এই রোগ নিয়ে বাংলাদেশ থেকে ফের। এবার ক’দিন ছিলে ঢাকায়? মাত্র আট দিন। তাকে জানালাম। দু’সপ্তাহ ছিলাম সিঙ্গাপুরে। তখন কিছু হয়নি। ২৭ এপ্রিল লন্ডনে ফেরার পথে আটদিনের জন্য ঢাকায় থেমেছি। দু’দিন না যেতেই এই অসুখ।
জিপি বললেন, বাংলাদেশে গেলেই দেখছি আমার সকল পেসেন্টই নানা রোগের ভাইরাস বহন করে ফিরে আসে। দীর্ঘদিন ভোগে। তোমরা এই দেশটাতে যাও কেন? বললাম, কি করব? এটা আমার স্বদেশ। এই দেশে জন্মেছি। তার অন্নে মানুষ হয়েছি। তা কি করে ভুলব?
জিপি আমার ওষুধের প্রেসক্রিপসন লিখতে লিখতে গুণগুন করে গানের একটি চয়ন গাইলেনÑ ‘ঐড়সবষধহফ সু যড়সবষধহফ, ড়য, রঃ রং হড় সড়ৎব সু ড়হি যড়সব’ একটি ইংরেজী গানের চরণ। শুনে আমার দেশে ব্রিটিশ আমলের এক কবির কবিতার পঙ্ক্তি মনে পড়লÑ ‘স্বদেশ স্বদেশ করিস তোরা, এ দেশ তো তোদের নয়।’ কথাটা মনে হলো, বড় নির্মম সত্য। অন্তত এবার আটদিন ঢাকায় অবস্থানের সময় এ কথাটাই মনে হয়েছে।
সেই সবুজ ঢাকা শহর নেই। নেই সেই সহজ সরল মানুষগুলোও। এখন এক কংক্রিটের দানব রোজই উর্ধ আকাশে মাথা তুলছে। মানুষগুলো যেন রোবট। অন্তত আমার তাই মনে হয়েছে। সিঙ্গাপুরে দেখেছি ঐশ্বর্যের সঙ্গে সৌন্দর্যের মিলন ঢাকায় দেখেছি ঐশ্বর্যের সঙ্গে কুৎসিত দরিদ্র ও বুভুক্ষার মিলন। শহরের অভিজাত ওয়েস্টিন হোটেলের বহুতল কোন ভোজন কক্ষে বসলে আপনার মনে হবে, নিউইয়র্কের ম্যানহাটনে বসে আছেন। হোটেল থেকে বেরিয়ে আসুন, মনে হবে আফ্রিকার কোন দরিদ্র দেশের গ্রাম এরিয়ায় নেমে এসেছেন।
রাস্তায় যানজট। এক মাইল যেতে তিন ঘণ্টা লাগে। খাদ্যে ভেজাল। পানি গ্যাস বিদ্যুত সঙ্কট। মে মাসের তাল পাকানো গরমে ঘন ঘন লোডশেডিং। আমি আটদিনেই অস্থির হয়ে গিয়েছিলাম। দিন গুনেছি, কখন লন্ডনে ফিরে আসব। নিজেকে ধিক্কার দিয়েছি, যে শহরে দুই কি তিন কোটি লোক বাস করে আমি সেখানে বাস করতে পারছি না কেন? মন বলেছে, তুমি বিশ্বাসে সমাজতন্ত্রী, কিন্তু শরীরে ও স্বভাবে পাঁতি-বুর্জোয়ারও অধম হয়ে গেছ। আমার ধারণা, তাই হয়েছি।
এক কুৎসিত দানবের পাশে এক সুন্দরী রমণীকে দাঁড় করালে মনে যে অনুভূতি জাগে এবার ঢাকা শহরকে দেখে আমার মনে সেই অনুভূতি জেগেছে। ঐশ্বর্য যে এত ভালগার হতে পারে এবং তার পাশে দরিদ্র যে এত নগ্ন ও বিকট চেহারা ধারণ করতে পারে, তা বাংলাদেশ ছাড়া আর কোন দেশে দেখতে পাইনি। এর বলি হয়েছে মানবতা, মানব মনের সকল সুকুমার প্রবৃত্তি। আমাকে ঢাকার এক প্রবীণ রিটায়ার্ড অফিসার বলেছেন, আগে বাংলাদেশের মানুষের মনে ছিল মহব্বত ও ইনসানিয়াত অর্থাৎ ভালবাসা ও মনুষ্যত্ববোধ। এখন তা নেই। এখন অন্ধ লোভ, হিংসা, সন্ত্রাস, কপটতা, নির্মম হৃদয়হীনতা সে স্থান দখল করেছে। গড়হবু রং হড়ি মড়ফ। এবং এই গডের পূজায় সারাদেশ উন্মাদ।
কথাগুলো চিরাচরিত আপ্তবাক্য মনে হতে পারে। কিন্তু আমার কাছে মনে হয়েছে নির্মম সত্য। ২৭ এপ্রিল ঢাকা শহরে পা দিয়েই শুনেছি, ২৯ ও ৩০ তারিখে পর পর দু’দিন হরতাল হবে। বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী নিখোঁজ হওয়ায় বিএনপি এই হরতাল ডেকেছে। বিএনপির হাতে কোন প্রমাণপত্র নেই। তারা ঘোষণা দিয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারই এই গুম-হত্যা করেছে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত। তাদের দায়িত্ব ইলিয়াস আলীকে খুঁজে বের করার। সেই দায়িত্ব পালনের আগেই তাঁরা ঘোষণা দিলেন, ইলিয়াস আলীকে বিএনপি লুকিয়ে রেখেছে। উদ্দেশ্য, রাজনৈতিক আন্দোলন করার ইস্যু তৈরি করা।
এ যেন হীরক রাজার দেশ। ইলিয়াস আলী নিখোঁজ হতেই বিএনপির উচিত ছিল, আগে তাকে জীবিত ও সুস্থ অবস্থায় উদ্ধার করার জন্য এ সরকারের কাছে জোর দাবি জাননো, বরং তার উদ্ধার প্রক্রিয়ায় সহযোগিতা করা। মানুষটিকে তো আগে জীবিত অবস্থায় চাই। তার প্রাণ বাঁচানো দরকার। বিএনপির কার্যক্রম দেখে মনে হলো, ইলিয়াস আলীকে তাদের দরকার নেই। তাদের দরকার একটি ইস্যু। নিখোঁজ নেতার প্রতি দরদ থাকলে কোন দল রাতারাতি তাকে ইস্যু বানাতে পারত না। আগে তার জীবন রক্ষা, তাকে উদ্ধারের চেষ্টা চালাত। বাংলাদেশের রাজনীতি কতটা হৃদয়হীনতায় গিয়ে পৌঁছেছে, ইলিয়াস আলী সংক্রান্ত ঘটনায় বিএনপির কার্যক্রম তার প্রমাণ। আগে তো অপহৃত মানুষটিকে উদ্ধার কর। তারপর আন্দোলন। যদি তদন্ত ও উদ্ধার প্রচেষ্টা শেষে প্রমাণিত হয়, আওয়ামী লীগ সরকারই এ কাজটি করেছে, তাহলে সারাদেশ সরকারের বিরুদ্ধে গর্জে উঠত। হরতাল ডাকা দরকার হতো না।
দু’দিনের হরতাল তাই সফল হয়নি। তা ভয়তালে পরিণত হয়েছে। নিরীহ পাঁচটি মানুষকে অপহরণে প্রাণ বলি দিতে হয়েছে। ঢাকায় এখন যে কেউ হরতাল ডাকলেই যে ভয়তাল হয়, হরতাল হয় না, তা আমি এবার নিজ চোখে দেখেছি। অর্থাৎ মানুষ হরতালের ডাকে সাড়া দেয় না, কিন্তু ভয়ে গাড়িঘোড়া বের করতে চায় না। দোকানপাট খুলতে চায় না। যে দল হরতাল ডাকে, তারা সদম্ভে দাবি করে, হরতাল সফল হয়েছে। হরতালের প্রথম দিন আমি ছিলাম ঢাকার মিরপুরে। দেখি এক তরুণী, সেজেগুজে কর্মস্থলে যাচ্ছেন। বললাম, আজ হরতাল। কাজে যাবেন কি করে? তরুণী বললেন, কিছুটা বাসে, কিছুটা রিক্সায় তারপর হেঁটে। যেসব রাস্তায় বিএনপির গু-ারা আক্রমণ চালাচ্ছে, সেসব রাস্তায় প্রাইভেটকার, বাস চলছে না। কিন্তু সবস্থানে রিক্সা চলছে। সবাই অফিস করছে।
এই হরতালের চেহারাটাও নিজের চোখে দেখলাম, অবশ্য টেলিভিশনের পর্দায়। যাত্রীবাহী বাস চলছে। তাতে সমানে ঢিল, পাথর ছুড়ছে বিএনপির সমর্থকেরা । বাসের জানালার কাঁচ ভেঙ্গে শিশুকোলে মা আহত হচ্ছে। কিন্তু নির্দয় পাথর বর্ষণের ক্ষান্ত নেই। টেলিভিশনে এই দৃশ্য যখন দেখানো হচ্ছে, তার পাশাপাশি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মীর্জা ফখরুল ইসলামেরও বক্তব্য প্রচারিত হচ্ছিল। তিনি বলছেন, সরকার শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক আন্দোলনের চেহারাটা কি, টেলিভিশনে একই সঙ্গে সেই দৃশ্য দেখছিলেন দর্শকরা। ইট-পাটকেল হাতে নিরীহ বাসযাত্রীদের ওপর নির্মম গু-ামি হচ্ছে শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক বিরোধিতা। এটা গেল ইলিয়াস আলীকে নিয়ে বিএনপির রাজনৈতিক ইস্যু সৃষ্টি করার খেলা। অন্যদিকে এই ব্যাপারে সরকারী দলের ভূমিকাটা কি? সাগর-রুনীর হত্যাকা-ের কিনারা তারা এখন পর্যন্ত করতে পারেননি। ইলিয়াস আলীর নিখোঁজ হওয়ার ব্যাপারেও সরকারের প্রাথমিক ও প্রধান দায়িত্ব তাকে খুঁজে বের করা। অপরাধীদের শনাক্ত করা। সে কাজটি না করে সরকার প্রথমেই বিএনপির পাতা ফাঁদে পা দিল। অর্থাৎ তদন্ত শুরু করার আগেই বলে দিল, ইলিয়াস আলীকে তার নিজের দলই গুম করে ফেলেছে। ব্যস, যে রাজনৈতিক ইস্যুটি বিএনপি তৈরি করতে চেয়েছিল, তা তৈরি হয়ে গেল। ইলিয়াস আলী চুলোয় যাক। তাকে উদ্ধারের নামে আরও পাঁচটি প্রাণ হরণ করা হলো। আর এই তথাকথিত হরতালে জনজীবনে দুর্ভোগের অন্ত ছিল না। এটা স্কুলের পরীক্ষার মৌসুম। হরতালের জন্য বহু পরীক্ষা হতে পারেনি। শিক্ষার্থীদের এই ক্ষতি ও দুর্ভোগের দিকটিও কেউ আমলে নেয়নি।
দেশে হত্যা, সন্ত্রাস ক্রমাগত বাড়ছে। সরকার তা সামাল না দিয়ে যদি বিরোধী দলের ওপর সব দায়দায়িত্ব চাপায়, তাহলে জনজীবনকে আশ্বস্ত করতে পারবেন না। প্রধানমন্ত্রীর সমুদ্র বিজয়ের নাগরিক সংবর্ধনার দিন আমি ঢাকা শহরেই ছিলাম। এই ব্যাপারে নাগরিক জীবনে কোন সাড়া, উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখিনি। আমার কাছে গোটা ব্যাপারটা মনে হয়েছে, স্তাবকদের নান্দীপাঠ। সমুদ্র বিজয় একটা উপলক্ষ মাত্র। এই বিজয়ের ঐতিহাসিকতা ও তাৎপর্য কিছুই জনজীবনে পৌঁছিয়ে দেয়া সম্ভব হয়নি। বিদ্যুত, পানি, গ্যাস সঙ্কটে জর্জরিত মানুষ এই সরকারের বড় সাফল্যগুলো দেখতে চায় না। আগে ছোট সাফল্যগুলো দেখতে চায়। যে ছোট সাফল্য তাদের দৈনন্দিন জীবনের দুর্ভোগ দূর করবে।
আমি হরতালের দিনগুলো ছাড়া যেদিনই এবার ঢাকার রাস্তায় বেরিয়েছি, সেদিনই ভয়াবহ যানজটে পড়েছি। আমার চাচা বাহাউদ্দীন চৌধুরী কিডনির গুরুতর রোগে আক্রান্ত হয়ে ঢাকার কম্যুনিটি হসপিটালে চিকিৎসাধীন আছেন। তাঁকে গাড়িতে চেপে মিরপুর থেকে দেখতে যেতে দু’দফায় আড়াই ঘণ্টা করে যানজটে আটকে ছিলাম। প্রচ- গরমে গাড়িতে বসে সিদ্ধ হয়েছি, আর ভেবেছি, মানুষ কেন এই অসহ্য অবস্থার বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়ায় না? বাঙালীর সেই ক্রোধ ও সাহস কোথায় গেল?
আমার অচল গাড়ির পাশ দিয়েই সেদিন এক মন্ত্রীর পতাকাশোভিত সচল গাড়ি দ্রুত ছুটে গেছে। যানজট তাকে আটকায়নি। ওয়াকিটকির সাহায্যে ট্রাফিক পুলিশকে আগেভাগে সিগন্যাল দিয়ে রাস্তা পরিষ্কার করে এয়ারকন্ডিশন্ড গাড়িতে মন্ত্রী পরম সুখে চলে যাচ্ছেন। অন্য কোন দেশ হলে এই মন্ত্রী এত সহজে রাস্তা অতিক্রম করতে পারতেন না। যানজটে ক্ষুব্ধ, ত্যক্ত মানুষ তার পথরোধ করত। তাকে গাড়ি থেকে টেনে নামাত। যেমন একবার টেনে নামিয়েছিল ফ্রান্সের এক মন্ত্রীকে।
এই মন্ত্রীকে চিনতে আমার দেরি হয়নি। ময়মনসিং-নন্দন। পাকিস্তান আমলে আরেক ময়মনসিং-নন্দন এভাবে বাঁশি ফুঁকিয়ে, গাড়ির আগে পিছে পাহারা নিয়ে ঢাকার রাস্তায় চলতেন। তিনি তখন ছিলেন গবর্নর। পরে ঢাকার সদরঘাটে জনতার হাতে তাকে নির্দয়ভাবে নাকাল হতে হয়েছিল। ক্ষমতায় থাকলে এসব ইতিহাস কেউ মনে রাখে না। তখন ইতিহাসের আবার পুনরাবৃত্তি ঘটে। প্রথমে ঘটে ট্র্যাজেডি, তারপর তা তামাশায় রূপান্তরিত হয়।
দুঃখ হয় বাংলাদেশের কথা ভেবে, ঢাকা শহরের অবস্থা দেখে। অবশ্য বাংলাদেশের সব শহরেরই আজ চেহারা একই ধরনের। এই চেহারা কি কোনদিন আবার পাল্টাবে, আবার সবুজ ও সতেজ হবে? মানুষ আবার তার হারানো মানবতাবোধ ফিরে পাবে? অবশ্যই একদিন ইতিহাসের চাকা ঘুরবে। ঘুরতে বাধ্য। কংক্রিটের দানবের এই কঠিন ভুজবন্ধন থেকে অবশ্যই মুক্ত হবে ঢাকা শহর। শয়তানের কাছে জিন্মি রাখা আত্মা ফাউসট আবার ফিরে পাবে। তবে তা দেখার জন্য অবশ্যই আমি সেদিন বেঁচে থাকব না। তাই গত শনিবার (৫ মে) যখন ঢাকা বিমানবন্দর থেকে লন্ডনের উদ্দেশ পাড়ি জমিয়েছি, সেদিন অপসৃয়মাণ ঢাকা শহরের দিকে তাকিয়ে বলেছি, ‘স্বদেশ, স্বদেশ করিস তোরা, স্বদেশ তো আর তোদের নয়।’
লন্ডন, ৮ মে, মঙ্গলবার ॥ ২০১২