মঙ্গলবার, ১২ জুন, ২০১২

আন্দোলন কেন বারবার ব্যর্থ আস্ফালনে পরিণত হচ্ছে?

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী


এগারোই জুন সোমবার এই লেখাটা লিখতে বসেছি। আজ বাংলাদেশে বিএনপির বহু বিঘোষিত বিক্ষোভ প্রদর্শন ও জনসমাবেশ দিবস। ১২ জুন মঙ্গলবার সকালে আমার এ লেখাটি যখন পাঠকদের চোখে পড়বে, তখন তাঁরা জেনে যাবেন, বিএনপি তার সরকারবিরোধী আন্দোলনের কতটা সূচনা করতে পারছে, নাকি তা আবার ব্যর্থ আস্ফালনে পরিণত হয়েছে। সাধারণত বিএনপি যেদিন হরতাল বা বিক্ষোভ সমাবেশ ডাকে, তার আগের রাতেই কিছু বাস, গাড়ি পুড়িয়ে এবং নিরীহ বাস ড্রাইভার বা রিকশাওয়ালাকে পুড়িয়ে মেরে তাদের শক্তির আগাম মহড়া দেয়।
এবার সেই মহড়া দেখা যায়নি। এই লেখাটি শুরু করার সময় পর্যন্ত, অর্থাৎ ১১ জুন ঢাকার সময় দুপুর ১২টা পর্যন্ত ঢাকা বা দেশের অন্য কোথাও গোলযোগের খবর পাইনি। তবে বিকেলে যখন মিছিল-সমাবেশ হবে, তখন কিছু গোলযোগ হতেই পারে। সরকার বিএনপি অফিসের সামনে এ সমাবেশের অনুমতি দিয়েছে। তবে জননিরাপত্তার জন্য কিছু কঠোর ব্যবস্থাও গ্রহণ করেছে। তাতে মনে হয়, মফস্বলের কথা বলতে পারি না, তবে ঢাকায় কোনো বড় ধরনের গোলযোগ হবে না। হলে অন্য কথা।
১১ জুন সকালে (লন্ডন সময়) এক ঢাকাইয়া বন্ধুকে শহরের খবর জানার জন্য টেলিফোন করেছিলাম। তিনি শিক্ষিত মানুষ। কিন্তু ঢাকাইয়া বাংলায় আমাকে বললেন, 'ছালায় (শালায়) হাঙ্গামা করার আদমি কই, সবাই তো ফাটকে বন্দি। ইট-পাটকেল মারার মানুষ ত ভাড়া করার ছুযোগ তারা পায় নাই।' তাঁর কথায় খুব একটা আশ্বস্ত হইনি। সরকারের দমননীতির মুখে বিএনপি এখন গর্তে লুকালেও জামায়াত গর্তে লুকায়নি। পালের গোদারা যুদ্ধাপরাধী হিসেবে অভিযুক্ত হয়ে জেলে থাকায় তাদের আন্দোলন করার শক্তি খর্ব হলেও খুন-জখম, জ্বালাও-পোড়াওয়ের দক্ষতা নষ্ট হয়নি। মনে হয়, আপাতত তারা যুদ্ধের স্ট্র্যাটেজি বদলাতে বাধ্য হয়েছে।
১০ জুন সরকারকে দেওয়া বিএনপির চরমপত্রের মেয়াদ শেষ। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিসহ দলটির আরো কিছু দাবি এই তারিখের মধ্যে মেনে নেওয়া না হলে তার পরই সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার যুদ্ধের দামামা বাজানো হবে বলা হয়েছিল। তবে এ দামামা এবার জোরেশোরে বাজেনি। কারণ দামামা বাজানোর জন্য, গর্জন-সেনাপতি হিসেবে বিএনপির মির্জা ফখরুলসহ যে নেতারা খ্যাত তাঁরা এখন জেলে। এমনকি বাজখাঁই গলার অধিকারী সাকা চৌধুরীও জেলে। কিছুদিন জেলের ভাত খাওয়ার পর তাঁরও বিক্রম কমে এসেছে মনে হয়। তিনি জানিয়েছেন, তাঁকে বিচার চলাকালে জামিনে মুক্তি দিলে তিনি খালেদা জিয়া ও দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করে সংসদ অধিবেশনে যোগ দেবেন (হায় রে খাঁচাবন্দি কেঁদো বাঘ!)।
সরকার বিরোধী দলের আলটিমেটাম বা চরমপত্র অগ্রাহ্য করেছে। একেবারে অগ্রাহ্য করত না, যদি তারা জানত বিএনপির আন্দোলন করার তাগদ আছে। গাড়ি পোড়ানো বা বাস ড্রাইভার, রিকশাচালক হত্যা তো আন্দোলন নয়। আন্দোলন হচ্ছে জনসমর্থনের জোরে সারা দেশ অচল করে দেওয়া। বিএনপি কোনো দিন তা পারেনি, কোনো দিন পারবে না। তারা যেটা পারে সেটা হচ্ছে, অসারের তর্জন-গর্জন। এই তর্জন-গর্জনে দলের নেত্রী থেকে শুরু করে পাতি নেতারা পর্যন্ত কতটা দড় তার প্রমাণ দেশের মানুষ বহুবার পেয়েছে।
এ সম্পর্কে আমার বন্ধু মোনায়েম সরকার একটি মজার কথা বলেন। তিনি বলেন, 'বিএনপি তো আন্দোলনের গ্রামারই (ব্যাকরণ) জানে না। তারা আন্দোলন করবে কি? ডোবায় জন্ম ব্যাঙাচি, বড়জোর ব্যাঙ হতে পারে। লাফ দিতে জানে, হাঁটতে জানে না। সেনা ছাউনিতে জন্ম বিএনপিরও আজ একই অবস্থা। আওয়ামী লীগকে অনুকরণ করে আন্দোলন করতে চায়। কিন্তু সেটা আন্দোলন হয় না। হয় ব্যর্থ আস্ফালন। বারবার এই ব্যর্থ আস্ফালনের পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। আন্দোলন আর হচ্ছে না।
১১ জুনও তাই বড় কিছু হচ্ছে বা হবে, তা আমার মনে হয় না। বিকেলের দিকের সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিল থেকে কিছু গোলযোগ হতে পারে, পুলিশের সঙ্গে লাঠালাঠি হতে পারে, তার বড় কিছু নয়। যেটা হবে, সমাবেশে দাঁড়িয়ে আবার বিএনপি নেত্রী ও অন্যান্য নেতার আস্ফালন। বর্তমান সরকারকে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করে সামনের ৪০ বছরেও আর ক্ষমতায় আসতে না দেওয়ার হুমকি। আরো কঠোর কর্মসূচি দেওয়ার ঘোষণা ইত্যাদি ইত্যাদি। দেশে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে হরতালবিরোধী যে মনোভাব, তাতে বুদ্ধিমান হলে বিএনপি নেতারা আর হরতালের ডাক দেবেন না। দিলে নিজেদের নাক তাঁরা নিজেরাই কাটবেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একটি কথা ভালোভাবেই বুঝে গেছেন, বিএনপির তত্ত্বাবধায়ক সরকার দাবির পেছনে কোনো আন্তরিকতা নেই। এই দাবি নিয়ে তারা যে হৈচৈ করছে, তার মূল উদ্দেশ্য, নির্বাচনে তারা হেরে যাবে- এটা বুঝতে পারলে তাতে অংশগ্রহণ না করার একটা পথ খোলা রাখা। এ ব্যবস্থাকে বিএনপিই ইয়াজউদ্দিনের প্রেসিডেন্টগিরির আমলে এমন বর্জ্য জাতীয় ব্যবস্থায় পরিণত করে গেছে যে এটি এখন একটি পচা আম। দুর্গন্ধ ছাড়া এ ব্যবস্থায় এখন আর কিছু নেই। এই ব্যর্থ ও দূষিত ব্যবস্থাকে পুনর্বহাল করে দেশে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করা যাবে কি? ১৯৯৬ সালে বিচারপতি হাবিবুর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। খালেদা জিয়া সেই নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে বলে মানতে চেয়েছিলেন কি? এখন তিনি কোন মুখে বলছেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া নির্বাচন সুষ্ঠু ও অবাধ হবে না?
বর্তমানে বিএনপির শত ডাকেও যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে আন্দোলন হচ্ছে না, তার বড় কারণ জনগণ এ ব্যবস্থার মাজেজা বুঝে গেছে। তারা আর পচা আমের খোসায় পা পিছলাতে রাজি নয়। তাই বিএনপি নেত্রীর এত আস্ফালন, সরকারকে আলটিমেটাম ইত্যাদি সত্ত্বেও এ দাবির পেছনে জনসমর্থন জড়ো করা যাচ্ছে না। দেশের মানুষ দেখতে চায় একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন, তা যে ব্যবস্থার অধীনেই অনুষ্ঠিত হোক না কেন।
তথাপি আগামী নির্বাচনকে সব বিতর্কের উর্ধ্বে রাখা এবং সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আওয়ামী লীগ সরকার নির্বাচনের আগে এক ধরনের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের বিষয়টি বিবেচনা করে দেখতে পারে। ১৯৪৬ সালে ভারত ভাগের আগে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ মিলে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার (Interim Government) গঠিত হয়েছিল, যে সরকারের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন কংগ্রেস থেকে নেহরু এবং মুসলিম লীগ থেকে অর্থমন্ত্রী হয়েছিলেন লিয়াকত আলী। অনুরূপভাবে বর্তমান বাংলাদেশে একটি নির্বাচনকালীন অন্তর্বর্তী মন্ত্রিসভা গঠিত হতে পারে। শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী থাকবেন। খালেদা জিয়া ও জেনারেল এরশাদ ডেপুটি প্রধানমন্ত্রী হবেন। মহাজোট ও ১৮ দলীয় জোট থেকে অন্যান্য মন্ত্রী গ্রহণ করা হবে। সংসদের বাইরেই এ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন নিয়ে সর্বদলীয় ভিত্তিতে আলোচনা হতে পারে। ঐকমত্যে পৌঁছলে তা সংসদে সর্বসম্মতভাবে পাস করালেই হবে। তবে আমার আশঙ্কা, আওয়ামী লীগ তার সব আন্তরিকতাসহ এ ধরনের প্রস্তাব নিয়ে এগোলেও বিএনপি তাতে সাড়া দেবে না। তাদের কথা 'সালিস মানি, তালগাছটা চাই।'
আমার অনেক বন্ধুর ধারণা, তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের দাবির পেছনে যথেষ্ট জনসমর্থন আছে। আমার তা মনে হয় না। দেশের মিডিয়াগুলোর লেখালেখি বা টেলিভিশনের টক শো দেখে যাঁরা এ কথা ভাবেন, তাঁরা বৃহৎ পল্লীবাংলার নাড়ির স্পন্দন জানেন না। বিএনপির এ দাবিতে শহুরে মধ্যবিত্তদের বিলাসী সমর্থন রয়েছে। গ্রামের মানুষ এ ব্যবস্থা নিয়ে মাথা ঘামায় না। ১৯৯৬ সালে যে ঘামিয়েছিল তার কারণ পরিস্থিতির বাস্তবতা, আওয়ামী লীগের তৎকালীন জনপ্রিয়তা এবং আন্দোলন করার সক্ষমতা ও কৌশল জানা।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি কেন কেবল আমাদের এলিট শ্রেণীর অবসরের বিলাসী বিতর্ক তার একটা উদাহরণ দিই। সাবেক ব্যুরোক্র্যাট এবং ইয়াজউদ্দিনের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সদস্য আকবর আলি খান একজন ভালো মানুষ এবং বুদ্ধিজীবীও। তিনি এখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সমর্থনে গলা মিলিয়েছেন, কিন্তু নিজে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রভাবশালী সদস্য থাকাকালে কয়েকজন সহকর্মীসহ যে পদত্যাগে বাধ্য হয়েছিলেন, তার কারণগুলো খোলাসা করে বলেন না কেন?
লেখাটা শুরু করেছিলাম বিএনপির সরকার হটাও আন্দোলন বা আস্ফালন নিয়ে। এ সম্পর্কে একটি মজার কথা বলে লেখাটা শেষ করতে চাই। বিএনপির নিরপেক্ষ নামে পরিচিত সমর্থক দৈনিকটি আজকাল হরতাল করার বদলে কিভাবে সফল আন্দোলন পরিচালনা করতে হবে, সে সম্পর্কে গাইডলাইন দেওয়া শুরু করেছে। একটি উপসম্পাদকীয়তে জোরালো ভাষায় পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, হরতাল করে জনগণের মনে বিরক্তি উৎপাদন না করে বিএনপির নেতা-কর্মীরা কেন দলে দলে কারাবরণ করে দেশের সব জেল ভর্তি করে সরকারকে অচল করে দেয় না?
লেখাটি পড়ে খুব মজা পেয়েছি। মহাত্মা গান্ধীর সত্যাগ্রহ ও অহিংস আন্দোলনের ডাকে হাজার হাজার মানুষ স্বেচ্ছায় কারাবরণ করে ব্রিটিশ-রাজের জেল ব্যবস্থা অচল করে দিত। আমার প্রশ্ন, বাংলাদেশের বর্তমান বিএনপি কি গায়ে-গতরে ব্রিটিশ আমলের কংগ্রেস? খালেদা জিয়ার ডাকে কয়জন নেতা-কর্মী যাবেন জেলখানা ভর্তি করতে? বেগম সাহেবা, একবার ডাক দিয়ে দেখুন। দলের কেন্দ্রীয় অফিস থেকে সব অফিস খালি হয়ে যাবে। ব্যারিস্টার মওদুদ যে এখন মিহিমিহি সুরে তর্জন-গর্জন করছেন, তাঁকেও আর খুঁজে পাওয়া যাবে না।
লন্ডন, ১১ জুন, সোমবার, ২০১২

রবিবার, ১০ জুন, ২০১২

নোবেলজয়ীর কাছে আমার কিছু সবিনয় নিবেদন


আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী
[সম্প্রতি ঢাকার কাগজগুলোতে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ‘গ্রামীণ ব্যাংকের ভবিষ্যৎ ও আমার শংকা’ শীর্ষক একটি নিবন্ধ বেরিয়েছে। বাংলাদেশ সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয় ১৫ মে, ২০১২ তারিখে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে গ্রামীণ ব্যাংক সম্পর্কে তদন্ত করে কোন অনিয়ম হয়ে থাকলে তা দূর করার জন্য সরকারকে সুপারিশ জানাতে যে তদন্ত কমিশন গঠনের ব্যব¯’া করেছে, তাতে ড. ইউনূস তার নিবন্ধটিতে শংকা প্রকাশ করেছেন। আমি তার এই শংকা সম্পর্কে ঢাকার কাগজেই তাকে একটি খোলা চিঠি লিখেছি। ওই চিঠিটা প্রকাশের পর আমার মনে হয়েছে, তার কাছে আমার সব কথা নিবেদন করা হয়নি। তাই এই দ্বিতীয় খোলা চিঠি। (লেখক)]
শ্রদ্ধেয় ড. মুহাম্মদ ইউনূস
আপনি একজন নোবেল-লরিয়েট। নোবেল পুরস্কার এখন যতই বিতর্কিত হোক, আপনার এই নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তিতে বাংলাদেশের আর ১০ জন মানুষের মতো আমারও গর্বিত হওয়ার কথা। কিš‘ আমি গর্বিত হতে পারিনি দুই কারণে। প্রথমত, পুরস্কারটি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আপনি যেভাবে নিজেই ‘অহংকারের এভারেস্টে’ আরোহণ করে এই পুরস্কার ও তার খ্যাতিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে (তখনকার আধাসামরিক শাসনের লক্ষ্য পূরণের যা সহায়ক হতে পারত) ব্যবহার করতে চাইলেন, এমনকি একটি রাজনৈতিক দল গঠনের ঘোষণা দিলেন, তখন মনে হয়েছিল, আপনাকে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। 
দ্বিতীয়ত, গত মহাযুদ্ধের পর থেকেই নোবেল পুরস্কার তার আগের মর্যাদা হারিয়ে একটি বিতর্কিত পুরস্কার। বার্ট্রান্ড রাসেল পঞ্চাশের দশকেই বলেছেন, ‘নোবেল পুরস্কার এখন øায়ুযুদ্ধে পশ্চিমা শিবিরের হাতে একটি মোক্ষম হাতিয়ার। এই পুরস্কারের প্রবর্তক আলফ্রেড নোবেল আজ যদি বেঁচে থাকতেন, তাহলে হয় এই পুরস্কারদান-ব্যব¯’া বাতিল করতেন অথবা এই পুরস্কার থেকে নিজের নাম প্রত্যাহার করতেন।’
রাসেল অত্যুক্তি করেননি। শান্তির জন্য মহাÍা গান্ধী সর্বাগ্রে এই পুরস্কার পাওয়ার যোগ্য বিবেচিত হননি। বিবেচিত হয়েছেন ইসরাইলের যুদ্ধাপরাধী ও মানবতাবিরোধী এক প্রধানমন্ত্রী। বাংলাদেশে হয়েছেন আপনি।
সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নকে ঘায়েল করার জন্য আমেরিকা øায়ুযুদ্ধে এই নোবেল পুরস্কার এত ন্যক্কারজনকভাবে ব্যবহার করেছে যে, এই পুরস্কারের আগেকার আন্তর্জাতিক ঔজ্জ্বল্য ও মর্যাদা এখন নিষ্প্রভ। সোভিয়েত ইউনিয়নকে ঘায়েল করার পর এখন এই হাতিয়ার ব্যবহার করা হ”েছ নয়াচীনের বির“দ্ধে। নয়াচীনের কমিউনিস্ট শাসন ও সংকুচিত নাগরিক স্বাধীনতার সমাজ ব্যব¯’ার বির“দ্ধে আমেরিকার দ্বারা প্ররোচিত ও উৎসাহিত হয়ে যারাই লেখালেখি করেন, তাদের বেছে নিয়ে নানা পুরস্কার দেয়া হয়। দেয়া হয়েছে নোবেল পুরস্কারও। 
গত বছর চীনের এমন এক সাহিত্যিককে নোবেল পুরস্কার দেয়া হয়েছে এবং তাকে নিয়ে সারাবিশ্বে হইচই ফেলে দেয়া হয়েছে। সম্প্রতি একজন পশ্চিমা সাহিত্য বিশেষজ্ঞ ও সমালোচক স্বীকার করেছেন, চীনের যে লেখককে নোবেল পুরস্কার দেয়া হয়েছে, তার সাহিত্য উ”চমানের, কিš‘ আন্তর্জাতিকমানের নয়। তাকে মেধা ও মানের জন্য পুরস্কার দেয়া হয়নি, দেয়া হয়েছে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে। এই উদ্দেশ্য কমিউনিস্ট চীনকে বিব্রত করা।
এই একই উদ্দেশ্যে এক সময় সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের সাহিত্যিক বরিস প্যাস্তারনাককে তার ‘ড. জিভাগো’ বইয়ের জন্য নোবেল পুরস্কার দেয়া হয়েছিল। এই বইটিকে টলস্টয়ের ‘ওয়ার অ্যান্ড পিসের’ সঙ্গে তুলনা করে বিশ্বব্যাপী দামামা পেটানো হয়েছিল। অথচ টলস্টয় নোবেল পুরস্কার পাননি। যেমন মহাÍা গান্ধী পাননি নোবেল শান্তি পুরস্কার। নোবেল পুরস্কারের আন্তর্জাতিক মর্যাদা বিতর্কিত হওয়ার আগেই বার্নার্ড শ’ এই পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। পরবর্তীকালে মরমী দার্শনিক ও সাহিত্যিক জাঁ পল সার্ত্র এই পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করে বলেন, ‘এই পুরস্কার নিলে আমি আমার শিল্পীর স্বাধীনতা হারাব এবং আমার মানবতাবাদী চেতনা আহত হবে।’ নোবেল পুরস্কারের বর্তমান স্ট্যাটাস সার্ত্রের এই উক্তি থেকে প্রণিধানযোগ্য। চকচক করলেই তামা যে সোনা হয় না তার প্রমাণ, এই সেদিনের নোবেল বিজয়ী বরিস প্যাস্তারনাক, তার বই ড. জিডাগোর নাম আজ আর কোথাও শোনা যায় না। বিস্মৃতির অন্ধকারে তা ডুবে গেছে। কিš‘ নোবেল প্রাইজ না পেয়েও টলস্টয় ও তার বই ‘ওয়ার অ্যান্ড পিস’ দীর্ঘকাল ধরে সারাবিশ্বে আদৃত। টলস্টয় বা øায়ুযুদ্ধের আগে নোবেল প্রাইজ পাওয়া রবীন্দ্রনাথকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য কোন প্রচার প্রোপাগান্ডার দরকার হয়নি। তারা নিজের গুণে এবং মাহাÍ্যইে মহীয়ান।
আপনি নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর বাংলাদেশে যে হইচই সৃষ্টি করা হয়েছিল এবং আপনি নিজেও ‘আনন্দের এভারেস্টে’ আরোহণ করে হইচই শুর“ করেছিলেন, তা একমাত্র ‘হুজুগে বাঙালির’ দেশেই সম্ভব। আপনার আগে ড. অমর্ত্য সেন নোবেল প্রাইজ পেয়েছেন। তিনি পশ্চিমবঙ্গের লোক। তার এই পুরস্কার পাওয়া নিয়ে পশ্চিমবঙ্গে আদৌ হুজুগ সৃষ্টি করা হয়নি এবং তিনি নিজেও পুরস্কারটি নিজেকে রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিকভাবে প্রোমোট করার কাজে লাগাননি। তিনি অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। আপনি পুরস্কারটি নিজেকে রাজনৈতিকভাবে প্রোমোট করার কাজে লাগিয়েছেন।
ড. অমর্ত্য সেনের নোবেল পুরস্কার পাওয়ার যোগ্যতা নিয়ে তার দেশেও কোন প্রশ্ন ওঠেনি। কিš‘ তার অর্থনৈতিক থিওরি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তার অর্থনীতিবিদ বন্ধুদেরই কেউ কেউ বলেছেন, ড. সেন তার অর্থনৈতিক থিওরিতে এক সময়ের অনুন্নত দেশগুলোতে দুর্ভিক্ষ সৃষ্টির যে প্রধান কারণগুলো দর্শিয়েছেন, তাতে আমেরিকাসহ পশ্চিমা সাবেক ঔপনিবেশিক দেশগুলো খুশি হয়েছে। কারণ, এ দুর্ভিক্ষ সৃষ্টির জন্য পশ্চিমা দেশগুলোর শোষণ ও লুণ্ঠনের সরাসরি দায়কে এ থিওরিতে অনেকটাই আড়াল করে ফেলা হয়েছে। অমর্ত্য সেন তাই পুরস্কৃত হয়েছেন।
তবু অমর্ত্য সেন একটি পাণ্ডিত্যপূর্ণ অর্থনৈতিক থিওরির জন্য নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। কিš‘ শ্রদ্ধেয় ড. ইউনূস, আপনাকে কোন্ থিওরি বা পাণ্ডিত্যের জন্য পুরস্কারটি দেয়া হল? আপনাকেও খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ বলা হয়। যদিও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি পড়ার সময় মাস্টার্স ডিগ্রির পরীক্ষাতেও ফার্স্ট হতে পারেননি। হয়েছিলেন আপনার সহপাঠী ও বন্ধু ড. ফখর“দ্দীন আহমদ। তিনি একজন অত্যন্ত ভালো মানুষ। কিš‘ আপনার প্ররোচনায় এক-এগারোর সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হতে গিয়ে তাকে আজ দেশছাড়া হতে হয়েছে। কথা ছিল, সেনা সমর্থিত সরকারের প্রধান আপনিই হবেন। আপনি আরও বড় উ”চাকাক্সক্ষা থেকে গোবেচারা ড. ফখর“দ্দীনকে স্টকিং হর্স হিসেবে ব্যবহার করে চমৎকারভাবে নিজেকে বাঁচিয়েছেন। না হলে আপনাকে নোবেল প্রাইজ দেয়ার আসল উদ্দেশ্য তখনই জানাজানি হয়ে যেত।
শ্রদ্ধাভাজন ড. ইউনূস, আমার এই খোলাচিঠিতে আপনার প্রতি কোন প্রকার রূঢ়তা প্রকাশ পেয়ে থাকলে আমাকে ক্ষমা করবেন। বর্তমানে আপনার ও আওয়ামী লীগ সরকারের মধ্যে যা চলছে তা দেশের জন্য ভয়ানক বিপদ ডেকে আনতে পারে। এ বিপদ এড়ানোর জন্যই অকপটে কিছু কথা বলা দরকার মনে করছি। আমার বক্তব্য ও বিশ্লেষণে যদি কোন ভুল-ভ্রান্তি থাকে, তাহলে অবশ্যই তা খণ্ডন করবেন। আপনি একজন বিশ্ববরেণ্য মানুষ। আমার মতো এক নগণ্য সাংবাদিকের কথার জবাব দিতে আপনাকে স্বয়ং নামতে হবে না। আপনার চারপাশে আমার চেয়ে শক্তিশালী অনেক লেখক, সাংবাদিক, মুগ্ধ ভক্তের দল আছেন। আছে দুটি জবরদস্ত মিডিয়া। আপনি চাইলেই তারা আপনার হয়ে আমার বির“দ্ধে লাঠির বদলে তলোয়ার ঘোরাতে শুর“ করবে। আমি অবিনয়ী কথা বলে থাকতে পারি, কিš‘ অসত্য বলে থাকলে খণ্ডিত হোক তা চাই।
আপনাকে অর্থনীতিবিদ বলা হয়। সামাজিক ব্যবসা, গ্রামীণ ব্যাংক ইত্যাদি যে কোন বিষয়ে আপনার ‘উদ্ভাবনা বুদ্ধিকে’ ‘জগজ্জয়ী প্রতিভা’ আখ্যা দিয়ে আপনাকে নোবেল পুরস্কার দেয়া যেত। পশ্চিমারা বিশেষ করে আমেরিকা দিতে চাইলে তা ঠেকায় কে? সুতরাং এসব বিষয়ে আপনাকে নোবেল পুরস্কার না দিয়ে নোবেল শান্তির পুরস্কার কেন দেয়া হল এটা ডে ওয়ান থেকে আমার মনে প্রশ্ন। মহাÍা গান্ধী শান্তি ¯’াপনের লক্ষ্যে ইউরোপের বোয়ার যুদ্ধে ভলান্টিয়ার হয়েছিলেন। আপনাকে কোন যুদ্ধে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য ভলান্টিয়ার হওয়া দূরের কথা নিজের ঘরের কাছে পার্বত্য শান্তিচুক্তি সম্পাদনে বা সেই যুদ্ধে রক্তপাত বন্ধ করতে সামান্য ভূমিকাও গ্রহণ করতে দেখা যায়নি।
তাহলে কি গরিবকে চড়া সুদে ঋণ দেয়াটা শান্তি প্রতিষ্ঠায় সবচেয়ে বড় অবদান? এ প্রশ্নের জবাব যদি হ্যাঁ সূচক হয়, তাহলে অবিভক্ত বাংলার একেবারে তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত ধনী-গরিব সব মানুষকে বিনা গ্যারান্টিতে চড়া সুদে ঋণ দেয়ার জন্য কাবুলিরা যে বিরাট নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিল, সেই কাবুলিওয়ালাদের শান্তি পুরস্কার দেয়া উচিত ছিল। সে সময় অত্যাচারী জমিদারদের খাজনা পরিশোধের জন্য গরিব চাষীরা কাবুলিওয়ালাদের কাছ থেকেও চড়া সুদে টাকা কর্জ নিত। তার পর সেই সুদ দিতে না পারলে কাবুলিদের হাতে তাদের ভয়াবহ নির্যাতনের অন্ত থাকত না। গ্রামীণ ব্যাংকের সুদ আদায়ে এ কাবুলি পদ্ধতিকে মডেল হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে বলে শুনেছি। অনেক ঋণগ্রহীতা নাকি আÍহত্যাও করেছেন।
কেউ কেউ বলেছেন, সাহিত্যে, শিল্পে, বিজ্ঞানে, চিকিৎসাশাস্ত্রে বিরাট অবদানের জন্য নোবেল পুরস্কার দেয়া হয়। এসব ক্ষেত্রে আপনার কোন অবদান খুঁজে না পেয়েই আপনাকে নাকি শান্তি পুরস্কার দেয়া হয়েছে। আপনাকে তখন আমেরিকা ও পশ্চিমা দেশগুলোর বিশেষ স্বার্থে নোবেল পুরস্কার দিতেই হবে, সুতরাং শান্তির মতো নিরাকার বিষয়টি বেছে নেয়া হয়েছে। আপনাকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেয়া ঠিক হয়েছে কিনা, আওয়ামী লীগের এক বেকুব মন্ত্রীর মতো সেই প্রশ্ন আমি তুলছি না, বরং নোবেল পুরস্কার দেয়ার পদ্ধতি সম্পর্কে এই বেকুব মন্ত্রী যে অর্বাচীন কথা বলেছেন, তাতে আমি লজ্জাবোধ করেছি। আপনার নোবেল পুরস্কার পাওয়ার যোগ্যতা সম্পর্কে আমার কোন প্রশ্ন নেই। প্রশ্ন তুলছি এই পুরস্কারটি আপনাকে দেয়ার উদ্দেশ্য সম্পর্কে। এটা কি একটা কাকতালীয় ব্যাপার নয় যে, আপনি নোবেল পুরস্কার পেলেন, আর সঙ্গে সঙ্গে সেটিকে মূলধন করে বাংলাদেশে হঠাৎ রাজনীতিকের ভূমিকায় নেমে এলেন? এবং তার আগে দেশে সেনা তাঁবেদার অগণতান্ত্রিক সরকার প্রতিষ্ঠার কাজে সমর্থন ও সহায়তা জোগালেন? কোথায় আপনি নোবেল পুরস্কার পাওয়ার গৌরব ও মর্যাদাকে কাজে লাগিয়ে দেশে গণতন্ত্র রক্ষায় মহৎ ভূমিকা নেবেন, না আপনি গেলেন এক-এগারোর তথাকথিত সিভিল সরকারকে ক্ষমতা গ্রহণে সহায়তা দিতে এবং আপনার মনোনীত ব্যক্তিকেই সেই সরকার প্রধানের পদে বসাতে। আপনার নোবেল পুরস্কার পাওয়ায় আমার গর্বিত বোধ না করার দ্বিতীয় কারণ এটি।
বাংলাদেশের তখন বড় দুর্দিন। দেশটির রাজনীতিকে শুদ্ধকরণের নামে (যে শুদ্ধিকরণের আপনি একজন বড় সমর্থক) সেনাবাহিনী সামনে শিখণ্ডী সিভিল সরকার খাড়া করে ক্ষমতা দখল করেছে। দেশের দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের নেত্রী জেলে। কারাবন্দি অসংখ্য রাজনৈতিক নেতা ও কর্মী। অত্যাচারের স্টিমরোলার নেমে এসেছে দেশের রাজনীতির ওপর। উদ্ভাবিত হয়েছে মাইনাস টু থিওরি। এই থিওরি বাস্তবায়নে সরবে সমর্থন জানা”েছ আপনার পৃষ্ঠপোষিত দুটি পত্রিকাই। 
শোনা গেল, এই মাইনাস টু থিওরির আসল উদ্ভাবক এবং সমর্থক পশ্চিমা দাতা দেশগুলো এবং তাদের অনুগৃহীত একটি বর্ণচোরা দেশী সুশীল সমাজ। আগে পশ্চিমা দেশগুলোÑ বিশেষ করে আমেরিকা অনুন্নত গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে গণতন্ত্র অকার্যকর এই ধুয়া তুলে সামরিক বাহিনী থেকে একজন ত্রাণকর্তা (ংধারড়ঁৎ) আবিষ্কার করে তাকে ক্ষমতায় বসাতেন। এখন কৌশল পাল্টে একজন ‘সিভিল ত্রাণকর্তা’ আবিষ্কার করে তাকে ক্ষমতায় বসান। যেমন, আফগানিস্তানে কারজাই এবং ইরাকে তারিকি। বাংলাদেশেও তখন আপনাকেই নাকি দেশটির সিভিল ত্রাণকর্তা হিসেবে বেছে নেয়া হয়েছিল। এবং সে জন্যই নাকি আপনাকে বাংলাদেশের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য ও মর্যাদাবান করে তোলার উদ্দেশ্যে হয়েছিল তড়িঘড়ি এ নোবেল শান্তি পুরস্কার দানের ব্যব¯’া। 
এই শোনা কথা কতটা সঠিক তা আমি জানি না। কিš‘ নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আপনি দেশবাসীকে ‘আনন্দের এভারেস্ট চূড়ায়’ আরোহণের আহবান জানিয়ে যে কাজটি করলেন, তাতে এই শোনা কথায় বিশ্বাস ¯’াপন করতে ই”েছ হয়। আপনি পুরস্কারটি বগলদাবা করে দেশে ফিরে এয়ারপোর্টে দাঁড়িয়েই নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের ঘোষণা দিলেন। তখন বাংলাদেশে রাজনীতি নিষিদ্ধ, রাজনৈতিক তৎপরতা আরও বেশি নিষিদ্ধ। ঠিক এই সময় আপনি কেমন করে দেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের ঘোষণা দেন, প্রকাশ্যে রাজনৈতিক তৎপরতা শুর“ করেন, সর্বোপরি এই তৎপরতা চালাতে এক-এগারোর সেনা তাঁবেদার সরকার আপনাকে সুযোগ ও সহায়তা দেন তা এক বিস্ময়কর ব্যাপার।
দুটি প্রধান রাজনৈতিক দলের নেত্রীই তখন কারাবন্দি। অসংখ্য রাজনৈতিক নেতাকর্মী জেলে। সারাদেশে ভীতির রাজত্ব। এমন সময় নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির খ্যাতি এবং আন্তর্জাতিক প্রভাবকে দুই নেত্রীর মুক্তি এবং দ্র“ত ভীতির রাজত্ব অবসানের কাজে না লাগিয়ে সেই প্রভাবকে কাজে লাগালেন নিজেকে রাজনৈতিক নেতা সাজানোর চেষ্টায় এবং দেশী-বিদেশী চক্রান্ত-জাত মাইনাস টু থিওরি বাস্তবায়নে সহায়তাদানের কাজে। নোবেল পুরস্কারকে মূলধন করে এটা তো ছিল ফাঁকা মাঠে গোল দেয়ার চেষ্টা করার মতো। কিš‘ আপনি হয়তো অত্যন্ত ঠেকে বুঝেছেন, প্রকৃত জনসেবার ট্র্যাক রেকর্ড না থাকলে এবং জনজীবনের শিকড়ে সমর্থন না থাকলে কেবল পুরস্কার, পদক ও বিদেশী মুরব্বিদের পৃষ্ঠপোষকতায় রাজনৈতিক নেতা হওয়া যায় না। আপনি বুদ্ধিমান মানুষ। এটা বুঝতে পেরেই রাজনৈতিক দল গঠনের ঘোষণা দিয়েই দ্র“ত লক্ষ্য থেকে প্র¯’ান করেছেন।
আপনার সমর্থকরা প্রচার চালা”েছন এবং লন্ডনের প্রভাবশালী দ্য ইকনোমিস্ট কাগজকে কব্জা করে কাগজটি দ্বারা প্রচার চালানো হ”েছ, শেখ হাসিনা আপনাকে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করেন এবং আপনার নোবেল পুরস্কার পাওয়ায় ঈর্ষান্বিত। ইকনোমিস্টের সম্প্রতি লেখাগুলোর নেপথ্যে বসে যারা আপনার হয়ে নাটাই ঘোরা”েছন, তারা কাগজটিকে দিয়ে এমন কথাও বলিয়েছেন যে, ‘হাসিনা সরকার গ্রামীণ ব্যাংকটিকে গ্রাস করতে চায়।’ আর কেউ না জানুক, আপনি জানেন, দুটি অভিযোগই সঠিক নয়। সরকারি অর্থ সাহায্যে প্রতিষ্ঠিত ব্যাংক সরকার গ্রাস করে কীভাবে? শেখ হাসিনা নিজে নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার জন্য মনে মনে খুবই আশা পোষণ করতে পারেন, কিš‘ বাংলাদেশের একজন সম্মানিত নাগরিক নোবেল পুরস্কার পাওয়ায় মোটেই ঈর্ষান্বিত হননি। বরং খুশিই হয়েছিলেন। বাঙালিদের নোবেল পুরস্কার পাওয়ায় তিনি আনন্দিত ও গর্বিত না হলে আরেক বাঙালি নোবেলজয়ী ড. অমর্ত্য সেনকে বারবার ঢাকায় ডেকে এনে সম্মান দেখাতেন না। আপনাকেও তিনি সম্মান দেখাতেন এবং অমর্ত্য সেনের মতোই বারবার কাছে টেনে নিতেন, যদি নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই আপনার চেহারাটি বেরিয়ে না আসত। এই চেহারাটি একজন ক্ষমতালোভী ব্যবসায়ীর, নোবেলজয়ী মনীষীর নয়।
আপনি শেখ হাসিনার রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হতে চাইলে তার ভীত হওয়ার কারণ ছিল না এবং এখনও নেই। আপনার আগে ড. কামাল হোসেনের মতো আন্তর্জাতিক খ্যাতির অধিকারী অনেক নেতার রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্মুখীন হয়েছেন তিনি এবং যুদ্ধে নামতে ভয় পাননি। এক্ষেত্রে আপনাকে ভয় পাবেন কেন? রাজনীতির মাঠে তিনি আরেকজন প্রতিদ্বন্দ্বীর সম্মুখীন হতেন মাত্র। কিš‘ আপনি নোবেল পুরস্কার ও বিদেশী মদদকে কাজে লাগিয়ে কেবল হাসিনা বা আওয়ামী লীগের বিরোধিতায় নামেননি, নামলে কথা ছিল না, আপনি নেমেছেন দেশের গণতন্ত্রবিরোধী চক্রগুলোকে মদদ জোগাতে। মাইনাস টু থিওরির বাস্তবায়ন এবং বাংলাদেশ সম্পর্কে পশ্চিমা দাতা দেশগুলোর স্বার্থপূরণের কাজে। আপনার রাজনৈতিক দল গঠন ছিল একটি ভাঁওতা। আপনার লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশকে রাজনীতিবর্জিত অগণতান্ত্রিক ব্যব¯’ার দিকে ঠেলে নেয়া।
ফলে শুধু শেখ হাসিনা নন, দেশের বাম ও গণতান্ত্রিক দল এবং বুদ্ধিজীবীরাও (আপনার পেটোয়া বুদ্ধিজীবীরা ছাড়া) আপনার ভূমিকা সম্পর্কে সন্ধিগ্ধ ও সতর্ক হয়েছেন। আপনি নোবেল পুরস্কার এবং গ্রামীণ ব্যাংকটিকেও আপনার রাজনৈতিক উ”চাকাক্সক্ষা ও স্বার্থ পূরণের উদ্দেশ্যে কি কাজে লাগাতে চাননি? এখন যদি গ্রামীণ ব্যাংকের ৩৪ বছরের কার্যকলাপ সম্পর্কে একটি সুষ্ঠু তদন্ত হয়, তাহলে হয়তো অনেক গুর“তর অনিয়ম বের হয়ে আসবে। আপনি যে সেই ভয়ে ভীত, আপনার ৩১ মে তারিখে ঢাকার কাগজগুলোতে প্রকাশিত ‘গ্রামীণ ব্যাংকের ভবিষ্যৎ এবং আমার শংকা’ শীর্ষক প্রবন্ধটিতে তা স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে।
আর এই ভয় থেকে আপনি হিলারি ক্লিনটনকে দিয়ে আবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে চিঠি লিখিয়েই ক্ষান্ত হননি, আপনি ছুটে গেছেন ব্রিটেনের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আলস্টার বার্টের কাছে। তাকে দিয়ে আবার বাংলাদেশ সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টিমূলক উক্তি করিয়েছেন। এটা একটি স্বাধীন দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে বিদেশী হস্তক্ষেপ ডেকে আনা। এ সম্পর্কে বাংলাদেশেরই একজন কলামিস্ট ও গবেষক রতন তনু ঘোষ সম্প্রতি তার এক লেখায় মন্তব্য করেছেন, ‘একজন নোবেল বিজয়ী ব্যক্তিত্ব রাজনীতি সম্পর্কে তার অভিমত দিতে পারেন। কিš‘ দেশের রাজনীতিকে বিদেশী হস্তক্ষেপের মুখোমুখি দাঁড় করাবেন, এটা কারও কাম্য নয়।’ এই মন্তব্য একজন দেশপ্রেমিক বাঙালির। আমার ধারণা গ্রামীণ ব্যাংক সম্পর্কে তদন্ত কমিশন গঠনেই আমাদের নোবেলজয়ী এত ভীত হয়ে পড়েছেন।
লন্ডন ।। ১০ জুন ।। রোববার ২০১২

শুক্রবার, ৮ জুন, ২০১২

ড. ইউনূসের কাছে একটি খোলা চিঠি


আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী
ধরে নেওয়া যাক, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন! তাহলে এই তদন্তে আপনার আপত্তি জানাবার বা ভীত হওয়ার কারণ কী থাকতে পারে? তাহলে আপনার আপত্তি কি তদন্ত কমিশন সম্পর্কে? তাদের স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্তে আপনি আস্থা রাখেন না? যে চারজন তদন্ত কমিশনের সদস্য হয়েছেন, তারা আপনার বিরোধী মহলের ব্যক্তি নন এবং তাদের নিরপেক্ষতা সম্পর্কে প্রশ্ন তোলার এখন পর্যন্ত
অবকাশ ঘটেনি



শ্রদ্ধেয় ড. মুহাম্মদ ইউনূস, আপনি আমার চেয়ে বয়সে ছোট, কিন্তু মানে, বিদ্যাবুদ্ধিতে এবং বিশ্বজোড়া খ্যাতিত্বে এত বড় যে, আপনাকে শ্রদ্ধা জানিয়ে এই চিঠিটা লেখা সমীচীন মনে করেছি। গত বৃহস্পতিবার ৩১ মে ঢাকার কাগজগুলোতে প্রকাশিত 'গ্রামীণ ব্যাংকের ভবিষ্যৎ এবং আমার শঙ্কা' শীর্ষক লেখাটা আমি পড়েছি। আমাকে ক্ষমা করবেন, লেখাটা পড়ে আমার মনে হয়েছে, বাংলাদেশের অর্থ মন্ত্রণালয় ১৫ মে ২০১২ তারিখে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করে গ্রামীণ ব্যাংক সম্পর্কে তদন্ত করে নানা বিষয়ে সরকারকে পরামর্শ দেওয়ার জন্য যে চার সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিশন গঠন করে দিয়েছে, তাতে আপনি অসন্তুষ্ট ও শঙ্কিত।
এই তদন্ত হবে গ্রামীণ ব্যাংকের জন্মকাল থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত, অর্থাৎ যে সময়টা আপনি ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করেছেন। আপনি কি এই তদন্তের ব্যাপারে ভীত? আপনি ব্যাংকটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্ব পালনকালে কি এমন কোনো অনিয়ম করেছেন, যাতে কোনো প্রকার তদন্তে আপনি শঙ্কিত হতে পারেন?
আপনার প্রবন্ধেই আপনি প্রশ্নটি তুলেছেন। লিখেছেন, 'সৃজনশীল যে কর্মপদ্ধতি এবং নতুন ধরনের ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি সৃষ্টি করে গ্রামীণ ব্যাংক গরিবের কল্যাণমুখী প্রতিষ্ঠান হিসেবে যে বিশ্বস্বীকৃতি পেল, সে কর্মপদ্ধতি, ব্যবস্থাপনা ও ফলাফলে সরকার সন্তুষ্ট হতে পারেনি বলেই কি তদন্ত কমিশন গঠন? অথবা গ্রামীণ ব্যাংক কি বড় রকমের কোনো অঘটন ঘটিয়েছে, যার জন্য তদন্ত কমিশন বসাতে হয়েছে? গ্রামীণ ব্যাংক এমন কী জনগুরুত্বপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে যে, তার ওপর তদন্ত চালাতে হবে? এ পর্যন্ত যত তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়েছে সেগুলো বড় রকমের অঘটন ঘটার পর, মানুষের মনে নানা প্রশ্ন জাগার কারণে সরকার তদন্ত কমিশন গঠন করে তার তদন্ত করেছে।'
এক কথায় আপনার প্রধান আপত্তি সরকার গ্রামীণ ব্যাংক সম্পর্কে তদন্ত কমিশন গঠন করায়। আপনার কাছে আমার সবিনয় প্রশ্ন, আপনার এই ঘোরতর আপত্তি কেন? আপনার গোটা প্রবন্ধটি 'ঠাকুর ঘরে কে রে, আমি কলা খাই না' গোছের লেখা। দীর্ঘ ৩৪ বছর (১৯৭৬-২০১০) গ্রামীণ ব্যাংকের নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব সম্পন্ন প্রধান নির্বাহী থাকাকালে আপনি কি এমন কোনো অনিয়ম করেছেন, যাতে কোনো প্রকার তদন্তে আপনার এই আপত্তি এবং শঙ্কা? যদি কোনো প্রকার অনিয়ম না হয়ে থাকে, তাহলে সরকার যত তদন্তই করুক, আপনার তো আপত্তি করার কিছু নেই। তদন্ত হওয়ার পর যদি দেখা যায়, তদন্তটি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ নয়, তাহলে অবশ্যই আপনি আপত্তি জানাবেন এবং দেশের মানুষও জানবে তদন্তের উদ্দেশ্য শুভ ও সাধু ছিল না। আপনি এই তদন্ত কমিশনের সুপারিশ জানার জন্য অপেক্ষা করেননি, তার আগেই আপত্তি জানিয়েছেন এবং দেশি-বিদেশি মিডিয়ায় শোরগোল তুলেছেন।
আপনার আপত্তি তদন্ত সম্পর্কে, না তদন্ত কমিশন সম্পর্কে? তদন্ত সম্পর্কে হলে বলতে পারি, আপনি ৩৪ বছর ধরে গ্রামীণ ব্যাংকে একচ্ছত্র ক্ষমতায় ছিলেন। কোনো রাষ্ট্রের স্থপতিও এত দীর্ঘকাল ক্ষমতায় থাকতে পারেন না (যারা বন্দুকের জোরে ক্ষমতায় থাকেন তাদের বেলায় অন্য কথা)। আপনার এই দীর্ঘ একচ্ছত্র রাজত্বকালে গ্রামীণ ব্যাংক সম্পর্কে কি কোনো অনিয়মের অভিযোগই ওঠেনি? সুদের চড়া হার, ঋণ পরিশোধে অসক্ষমদের ওপর কাবুলি-নির্যাতন, ঋণগ্রহীতাদের কারও কারও আত্মহত্যা, শেয়ারহোল্ডারদের কোনো মুনাফার অংশ না দেওয়ার ব্যবস্থা, ঋণদাতা দেশগুলোর কাছ থেকে গ্রামীণ ব্যাংকের নামে ঋণ নিয়ে তাদের অজ্ঞাতে সেই অর্থ নিজের অন্য প্রকল্পে নিয়োগ করা, গ্রামীণ ব্যাংকের অর্থ ও শক্তি এবং নোবেল পুরস্কারকে দেশে গণতন্ত্রবিরোধী রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করার চেষ্টা করা ইত্যাদি অসংখ্য অনিয়ম ও অব্যবস্থার অভিযোগগুলো কি গত কয়েক বছর ধরে অনবরত আপনার বিরুদ্ধে ওঠেনি? এই ধরনের অভিযোগ সম্পর্কে কোনো দেশের সরকারেরই কি চোখ মুদে থাকা সম্ভব?
ধরে নেওয়া যাক, অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন! তাহলে এই তদন্তে আপনার আপত্তি জানাবার বা ভীত হওয়ার কারণ কী থাকতে পারে? তাহলে আপনার আপত্তি কি তদন্ত কমিশন সম্পর্কে? তাদের স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্তে আপনি আস্থা রাখেন না? যে চারজন তদন্ত কমিশনের সদস্য হয়েছেন, তারা আপনার বিরোধী মহলের ব্যক্তি নন এবং তাদের নিরপেক্ষতা সম্পর্কে প্রশ্ন তোলার এখন পর্যন্ত অবকাশ ঘটেনি। তথাপি আপনি এই কমিশন সম্পর্কে প্রশ্ন তুলেছেন এবং বলেছেন, 'আন্তর্জাতিক মানের অডিট ফার্মকে গ্রামীণ ব্যাংকের আর্থিক লেনদেনের ইতিহস বের করতে দিলে তারা সব কথা বের করে নিয়ে আসবে। এর জন্য পুরোদস্তুর তদন্ত কমিশন বসানোর দরকার কী?
আপনাকেই বিনয়পুরসর জিজ্ঞাসা করি, কোনো প্রতিষ্ঠানের আর্থিক লেনদেনের হিসাব খতিয়ে দেখা আর ৩৪ বছর ধরে চলা নানা অনিয়মের অভিযোগ সম্পর্কে তদন্ত করে সেই অনিয়ম দূর করার সুপারিশ জানানো কি এক কথা? গ্রামীণ ব্যাংক পরিচালনার বিভিন্ন অনিয়ম ও এতকালের ব্যক্তিকেন্দ্রিক অব্যবস্থার কারণগুলো দূর করে ব্যাংকটির উন্নয়নের পদক্ষেপ নেওয়া কি সরকারের আরও আগে উচিত ছিল না? এখন সরকার সেই পদক্ষেপ নেওয়ায় আপনি কি ভাবছেন, 'কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে আসতে পারে?'
এই তদন্ত ও তদন্ত কমিশন সম্পর্কে আপনি কতটা ভীত তার প্রমাণ মেলে আপনার লেখার একটি মন্তব্যে। আপনি লিখেছেন, 'এই তদন্ত কমিশনের সময়সীমা দেখে মনে হতে পারে ছুরি-কাঁচি নিয়ে প্রস্তুত হয়ে কাজে নামা ছাড়া তাদের গতি নেই।' অর্থাৎ এই ছুরি-কাঁচি আপনার বিরুদ্ধেই ব্যবহৃত হবে বলে ভয় পাচ্ছেন। আপনার লেখার পরবর্তী মন্তব্যটি পড়লেই এই ভীতিটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আপনি লিখেছেন, '... গ্রামীণ নামের কোম্পানিগুলো নিয়ে সরকারের অনেক প্রশ্ন। প্রশ্নগুলো পড়লে মনে হয় হয়তো সরকারের ধারণা যে, কোম্পানিগুলো গ্রামীণ ব্যাংকের মালিকানায় সৃষ্টি হয়েছে, অথচ সেগুলো গ্রামীণ ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে নেই।' অর্থাৎ মালিকানা হস্তান্তর হয়েছে। এভাবে দাতা সংস্থাকে না জানিয়ে অন্য প্রকল্পে অর্থ সরানোর গুরুতর অভিযোগ কি একবার এক বিদেশি সাংবাদিক আপনার বিরুদ্ধে তোলেননি? আপনি অসাধারণ বুদ্ধি কৌশলে, নিজের নোবেল পুরস্কার পাওয়ার সুনাম ভাঙিয়ে সেই অভিযোগ সামাল দিয়েছিলেন। এখন আপনি চাচ্ছেন, এসব গুরুতর অভিযোগ সম্পর্কে যেন নতুন করে কোনো তদন্ত না হয়; কেবল ব্যাংকের হিসাবপত্র অডিট করার মধ্যে সব কার্যক্রম সীমাবদ্ধ থাকে।
আপনার মতো একজন বিশ্ববিশ্রুত পণ্ডিতের লেখায় এত স্ববিরোধিতা আছে যে আমি বিস্মিত হয়েছি। যেমন আপনার লেখার এক স্থানে আপনি উল্লেখ করেছেন, 'আমার উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানগুলোর নামের সঙ্গে আমি গ্রামীণ নাম ব্যবহার করে এসেছি।... আইন অনুসারে এদের কোনো মালিক নেই।... এগুলো থেকে কেউ মুনাফা পায় না। যেহেতু কারও এতে মালিকানা নেই।' আবার অন্যত্র বলেছেন, 'গ্রামীণ ব্যাংকের মালিকদের মধ্যে শতকরা ৮০ ভাগই নিরক্ষর মহিলা।' গরিব মহিলাদের এই মালিকানা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের সর্বময় ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেওয়ার জন্যই সরকার সচেষ্ট বলেও আপনি অভিযোগ করেছেন। বলেছেন, 'নারীর ক্ষমতায়নে বিশেষ করে গরিব মানুষের ক্ষমতায়নে যারা বিশ্বাসী, তাদের এ ব্যাপারে সোচ্চার হতে অনুরোধ জানাচ্ছি। আমি আমার এই লেখাটি ছাপিয়ে গ্রামীণ ব্যাংকের সকল শাখায় পাঠাচ্ছি, যাতে ঋণগ্রহীতা মালিকরা তাদের মালিকানা রক্ষা করার জন্য তারাও স্থানীয় গণ্যমান্যদের মাধ্যমে সরকারের কাছে অনুরোধ জানাতে পারেন।'
একবার বলা আপনার প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ নামধারী প্রতিষ্ঠানগুলোর আইন অনুসারে কোনো মালিক নেই (মালিক আসলে আপনিই), তারপরই বলা গ্রামীণ ব্যাংকের মালিকদের ৮০ ভাগই নিরক্ষর মহিলা_এটা যে কত বড় শুভঙ্করের ফাঁকি, আমি এ সম্পর্কে পরে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করব।
শ্রদ্ধেয় ড. মুহাম্মদ ইউনূস আপনাকে সকল আন্তরিকতা নিয়ে বলছি, ৩১ মে প্রকাশিত আপনার লেখাটিতে স্ববিরোধিতাপূর্ণ অনেক কথাবার্তা থাকা সত্ত্বেও এই লেখাটি নিয়ে আমার কোনো ধরনের আলোচনা করার ইচ্ছা ছিল না। কিন্তু গত ২৬ মে লন্ডনের দি ইকোনমিস্টে প্রকাশিত 'পলিটিক্স ইন বাংলাদেশ' শীর্ষক লেখাটিতে আপনার প্রসঙ্গ বারবার টেনে বাংলাদেশ সরকারের ওপর যেভাবে আক্রমণ চালানো হয়েছে এবং বাংলাদেশে ভারতকে হস্তক্ষেপের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে, তার সঙ্গে আপনার ৩১ মের লেখাটি মিলিয়ে পড়ে আমার মনেও শঙ্কা দেখা দিয়েছে। আপনার শঙ্কা গ্রামীণ ব্যাংক নিয়ে। আমার শঙ্কা সারা বাংলাদেশ নিয়ে।
আমার এই শঙ্কা আরও বেড়েছে, এখন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে চিঠি লিখে আবার গ্রামীণ ব্যাংক নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি লিখেছেন, গ্রামীণ ব্যাংকের অখণ্ডতা যেন রক্ষা পায় এবং এ সম্পর্কে তদন্ত কমিশনের তদন্তে যেন স্বচ্ছতা থাকে।
বিশ্বের একক সুপার পাওয়ারের প্রভাবশালী এক নেত্রীর উদ্বেগ বাংলাদেশ নিয়ে নয়, তার উদ্বেগ একটি বাংলাদেশি ব্যাংক সম্পর্কে এবং এই ব্যাংক সম্পর্কে সরকারি তদন্ত কমিশনের ভূমিকাতেও তিনি নাক গলাতে চান। এ ব্যাপারটির মহাআশঙ্কাজনক দিকটির কথা কি আপনি ভেবে দেখেছেন? এটা একটা স্বাধীন দেশের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে পরাশক্তির ঔদ্ধত্যপূর্ণ হস্তক্ষেপ। আপনি এই একটি ব্যাপারে দেশের সুপ্রিম কোর্টের রায়কেও আমল দেননি। দেশের তদন্ত কমিশনের সুপারিশ জানার জন্যও অপেক্ষা করতে চান না। বিদেশি মিডিয়া বিশেষ করে ইকোনমিস্টের গ্রামীণ ব্যাংককে কেন্দ্র করে বাংলাদেশবিরোধী প্রচার, হিলারি ক্লিনটন ও মার্কিন রাষ্ট্রদূতের সীমা অতিক্রমকারী কথাবার্তা এসবের পেছনে আপনার কী সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে এবং গ্রামীণ ব্যাংকে আপনার কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য আপনি বিদেশি হস্তক্ষেপও টেনে আনতে চান? আপনি যে আগুন নিয়ে খেলছেন, শুধু এই কথাটা আপনাকে বোঝানোর জন্যই আপনার কাছে আমার এই খোলা চিঠি লেখা। নিজেকে এবং নোবেল পুরস্কারটিও আপনি যেন আর বিতর্কিত না করেন।
লন্ডন, ৭ জুন ২০১২, বৃহস্পতিবার

মঙ্গলবার, ৫ জুন, ২০১২

গণকল্যাণকামী রাজতন্ত্র স্বৈরাচারী প্রজাতন্ত্রের চাইতে অনেক বেশি ভাল

খুব বেশি দিন আগের কথা নয়। সম্ভবত পনেরো কুড়ি বছর আগের কথা। ব্রিটেনের বর্তমান রাণী দ্বিতীয় এলিজাবেথ বাকিংহাম প্রাসাদে তাঁর শয়নকক্ষে ঘুমাচ্ছিলেন। মধ্যরাত পেরিয়ে গেছে। হঠাৎ কি একটা শব্দে রানীর ঘুম ভেঙ্গে গেল। জেগে উঠে দেখেন একটা অপরিচিত লোক তাঁর শয্যাপার্শ্বে বসে আছে। রাণী বিস্মিত হলেন। এই কঠোর পাহারাধীন রাজপ্রাসাদে সাধারণ বেশভূষার এই লোকটি ঢুকল কেমনে? সে কি একজন গুপ্ত ঘাতক? রানী ভীত হলেন না। ভীত হয়ে চিৎকার করে সেপাই সান্ত্রীদেরও ডাকলেন না। বরং শিষ্টাচারের সঙ্গে লোকটির সঙ্গে কথা বলতে শুরু করলেন। সে কে, কি করে ইত্যাদি কথা। লোকটিও রানীর কাছে একটা সিগারেট খেতে চেয়েছিল।
রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথের প্রজ্ঞা, সাহস ও বুদ্ধিমত্তার পরিচয় সেদিন আরও ভালভাবে প্রকাশ পেয়েছে। লোকটি গুপ্ত ঘাতক হলে রানীকে সে রাতে অনায়াসে হত্যা করতে পারত। কিন্তু সে আশঙ্কায় কাতর না হয়ে তিনি তাঁকে সহজ কথাবার্তায় ভুলিয়ে রেখে সময় কাটিয়ে দেন। ইত্যবসরে প্রাসাদ রক্ষীরা ঘটনাটির আঁচ পায়। তারা সঙ্গে সঙ্গে রানীর নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে এবং লোকটিকে ধরে ফেলে। পরে জানা যায়, লোকটি উন্মাদ কিংবা গুপ্ত ঘাতক নয়, সে সুযোগ পেয়ে প্যালেসে ঢুকেছিল। কি উদ্দেশ্যে, কেমন করে ঢুকেছিল সে খবর পরে প্রকাশ করা হয়েছিল, তা এখানে প্রাসঙ্গিক নয়।
ব্রিটিশ রানীর প্রতি সেদিন আমার ব্যক্তিগত শ্রদ্ধা বেড়ে যায়। এই শ্রদ্ধা আরও বেড়ে যায় আরও একটি ঘটনায়। মার্গারেট থ্যাচার তখন ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ছিলেন রিগান। আমেরিকার সঙ্গে ব্রিটেনের সম্পর্ক তখন মিত্রতা থেকে আনুগত্যে পরিণত হয়। পরবর্তীকালে ব্রিটেনের লেবার দলীয় প্রধানমন্ত্রী ব্লেয়ারকে যেমন বলা হতো মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশের ‘পুডল’, তেমনি তার আগে মার্গারেট থ্যাচারকে বলা হতো প্রেসিডেন্ট রিগানের ‘পলিটিক্যাল মিসট্রেস।’ মার্কিন নীতির প্রতি আনুগত্য ছিল থ্যাচারের পররাষ্ট্রনীতির বৈশিষ্ট্য।
ইরাক আক্রমণের জন্য জর্জ বুশ যেমন সাদ্দামের হাতে বিশ্বধ্বংসী মারণাস্ত্র আছে বলে মিথ্যা অজুহাত তুলেছিলেন; তার আগে রিগান তেমনি কিউবা ও ফিদেল ক্যাস্ট্রোকে বিশ্বশান্তির জন্য বিপজ্জনক শক্তি আখ্যা দিয়ে মিথ্যা প্রচার চালান যে, গ্রেনেডা নামক দেশটিতে কিউবা সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করেছে এবং গ্রেনেডার সৈন্যদের যুদ্ধের জন্য ট্রেনিং দিচ্ছে। এমনকি জঙ্গী বিমান অবতরণ উড্ডয়নের জন্য এয়ারপোর্টে বিশেষ রানওয়ে তৈরি করছে। এই মিথ্যা অজুহাতে আমেরিকা গ্রেনেডায় হামলা চালায় এবং দেশটি দখল করে।
গ্রেনেডা (ব্রিটিশ) কমনওয়েলথের অন্তর্ভুক্ত দেশ। ব্রিটিশ রানী তাঁর নিয়মতান্ত্রিক প্রধান। এই দেশে হামলা চালাতে হলে তাঁর একটা আনুষ্ঠানিক অনুমতি প্রয়োজন। ব্রিটেনের রানীকে এটুকু সৌজন্য দেখানোও প্রয়োজন মনে করেননি। মার্গারেট থ্যাচার ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী থাকা সত্ত্বেও এর কোন প্রতিবাদ জানাননি। রানী তাতে ক্ষুব্ধ হন। কিন্তু তিনি কনস্টিটিউশনাল মনার্ক। নির্বাচিত সরকারের কাজে বাধা দিতে পারেন না। কমনওয়েলথের অবমাননা বরদাশ্ত করার মতো রাইী তিনি নন।
গ্রেনেডায় মার্কিন হামলায় পর পরই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মার্গারেট থ্যাচার যখন রানীর সঙ্গে তাঁর মাসিক সাক্ষাতকারের সভায় যান, তখন রানী তাঁকে তাঁর সামনে বসার অনুমতি দেননি। রানী অনুমতি না দেয়া পর্যন্ত কোন প্রধানমন্ত্রী বা মন্ত্রী তাঁর সামনে আসন গ্রহণ করতে পারেন না। রানী সাধারণত সকলকেই আসন গ্রহণের অনুরোধ জানান। সেদিন মার্গারেট থ্যাচারকে আসন গ্রহণের অনুমতি দেননি। তাঁকে এক ঘণ্টা রানীর সামনে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছিল। ব্রিটেনের কাগজগুলোতে তখন এই খবর ফলাও করে ছাপা হয়েছিল এবং বলা হয়েছিল, গ্রেনেডার ঘটনায় আত্মসম্মানে আঘাত লাগায় রানী এইভাবে তাঁর ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। খবরটি পাঠ করে শ্রদ্ধায় তাঁর প্রতি মাথা নুইয়ে মনে মনে বলেছি, তাঁকে তাসের রানী বলা হলেও তিনি তা নন।
দীর্ঘ ষাট বছর তিনি ব্রিটেনের নিয়মতান্ত্রিক প্রধান। অন্তত ১২ জন প্রধানমন্ত্রী তিনি এই সময়ে দেখেছেন। চার্চিলের মতো ঝানু রাজনীতিক এবং বর্ষীয়ান ব্যক্তিত্বকে তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পেয়েছেন। আবার বর্তমানে ডেভিড ক্যামেরনকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পেয়েছেন, যার বয়স তাঁর সকল সন্তানের চাইতে অনেক কম। সবচাইতে বিস্ময়ের কথা, গত ষাট বছরে অনেক সমাজতন্ত্রী (লেবার) এবং কট্টর ধনতান্ত্রিক (কনজারভেটিভ) দল তাঁর অধীনে সরকার পরিচালনা করেছে। এই সরকারগুলোর নীতিগত বৈপরীত্য তাঁর নিরপেক্ষতাকে স্পর্শ করেনি। তিনি কোন জনপ্রতিনিধিত্বমূলক সরকারের কাজে হস্তক্ষেপ করেননি, কোন নির্বাচিত সরকারও রানীর নিয়মতান্ত্রিক মর্যাদাকে ক্ষুণ করেনি।
ব্রিটিশ রাজতন্ত্র এক সময় পার্লামেন্টের সঙ্গে, চার্চের সঙ্গে বিরোধ ও সংঘাতে জড়িয়েছে, কিন্তু গত দেড় শ’, দু’শ’ বছর ধরে তাঁরা তাঁদের নিয়মতান্ত্রিক অবস্থান থেকে ব্রিটিশ গণতন্ত্রের ছাতাটিকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করে আছেন। ব্রিটিশ গণতন্ত্রের রক্ষাকবচের মতো এই রাজতন্ত্র। এই রাজতন্ত্রের লক্ষ্য রাজ্য শাসন নয়, বরং গণকল্যাণ। বর্তমান রানীর চরিত্রে তাই মানবিক গুণাবলীর বহির্প্রকাশ স্পষ্ট। গত ষাট বছরে ব্রিটিশ রাজতন্ত্র এত সঙ্কটের মুখোমুখি হয়েছে। অনেকে ভেবেছেন তা অনতিক্রমনীয়। কিন্তু রানী এলিজাবেথ অসীম ধৈর্য ও প্রজ্ঞার সঙ্গে তা অতিক্রম করেছেন। 
সাম্রাজ্য হারানোর পর ব্রিটেনের মানুষের এক উল্লেখযোগ্য অংশ ভেবেছে, এই ব্যয়বহুল রাজতন্ত্র অনাবশ্যক। তার বদলে প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা হোক। রানীর নিরলস পরিশ্রম, দেশ-বিদেশ ঘুরে ব্রিটেনের ভাবমূর্তি নতুনভাবে প্রতিষ্ঠা এবং সাবেক উপনিবেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের উন্নয়ন এবং ব্রিটিশ অর্থনীতির সম্প্রসারণ প্রমাণ করেছে, এ রাজতন্ত্র ব্রিটেনের বিশ্ব-ভূমিকা ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য অপরিহার্য। ব্রিটেনের এক বামপন্থী বুদ্ধিজীবী একবার লিখেছিলেন, আমি ঈশ্বরে বিশ্বাস হারাতে পারি, কিন্তু ব্রিটিশ রাজতন্ত্রে বিশ্বাস হারাতে চাই না।’ ব্রিটেনে যাঁরা রাজতন্ত্র প্রথার ঘোর বিরোধী, তাঁদের অনেকেই বর্তমান রানীর প্রতি শ্রদ্ধা পোষণ করেন। 
এক সময় মনে হয়েছিল, এই রাজত্ব বুঝি dysfuctional বা অকার্যকর হয়ে গেছে। রাজপরিবারের ক্রমাগত বিবাহ বিচ্ছেদ, বিরাট পরিবারের অনেক সদস্যের আচার ব্যবহার জনমনে ক্ষোভ সৃষ্টি করেছিল। রাজপরিবার বুঝি সম্পূর্ণ গণসম্পৃক্তা হারিয়েছে, এই আশঙ্কা যখন ডালপালা ছড়াচ্ছে, তখন রাজপরিবারে প্রিন্সেস ডায়ানার অন্তর্ভুক্তি এই ধারণা সম্পূর্ণ পাল্টে দেয়। জনসেবায় ডায়ানার নিষ্ঠা তাঁকে people of princess বা জনগণের রাজকুমারীতে পরিণত করে। সম্ভবত বর্তমান রানী তাঁর প্রয়াত পুত্রবধূর কাছ থেকেও এ ব্যাপারে কিছুটা শিক্ষা গ্রহণ করেছেন। 
ডায়ানার আকস্মিক মৃত্যুর পর ব্রিটিশ জনগণ এতটা ক্ষুব্ধ এবং রাজপরিবারকে সেজন্য এতটা দায়ী মনে করেছিল যে, এক সময় রাজতন্ত্র বিরোধী ব্যাপক জনমত গড়ে ওঠার আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল। রানীর এবারের ডায়মন্ড জুবিলি উপলক্ষে লেখা সম্পাদকীয়তে (৩ জুন রবিবার) সানডে টাইমস মন্তব্য করেছে ‘....after the death of Diana, for a number of hours the Monarchy feared being abused in the street'.(ডায়ানার মৃত্যুর পর কয়েক ঘণ্টা ধরে রাজপরিবারের সদস্যরা আশঙ্কা করছিলেন রাস্তায় পেলে তাদের মারধর করা হবে।)’
এই ভয়ানক পরিস্থিতি থেকেও ব্রিটিশ রাজ পরিবার ও রাজতন্ত্রকে রক্ষা করেছেন রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ। তিনি সাহসের সঙ্গে জনগণের সম্মুখীন হয়েছেন, ডায়ানার প্রতি যথোচিত সম্মান দেখিয়েছেন এবং জনগণের সেবায় এবং তাদের নৈকট্যে আরও বেশি সরে এসে তাঁদের হারানো আস্থা পুনরুদ্ধার করেছেন। এখন জনমত জরিপে দেখা যায়, ব্রিটেনের জনসংখ্যার বিরাট অংশই রাজতন্ত্র বহাল রাখার পক্ষপাতী।
রানীর চরিত্রে রাজকীয় আভিজাত্য আছে, কিন্তু তা মানবিকতার গুণম-িত। একবার তিনি অস্ট্রেলিয়া সফরে গেছেন দেশটির নিয়মতান্ত্রিক প্রধান হিসেবে। এক বিক্ষুব্ধ আদিবাসী নেতা রানীকে সংবর্ধনা জানাতে এসে তাঁকে নগ্ন পশ্চাদ্বেশ দেখিয়েছিল। রানীর হস্তক্ষেপে তাৎক্ষণিক পুলিশী নির্যাতন থেকে সে বেঁচে যায়। একবার রানী বাংলাদেশ সফরে গেছেন। এক দুস্থ শিশু কল্যাণ কেন্দ্রে তিনি গেলে এক দুস্থ শিশু মায়ের কোলে বসে তাঁর ময়লা হাতে রানীর গলার হার চেপে ধরেছিল। রানী বিব্রত হননি। মিষ্টি হেসে শিশুটিকে আদর করে গলার হারটি তার হাত থেকে মুক্ত করেছিলেন। এবার নারীবর্ষ উপলক্ষ করে কমনওয়েলথ-প্রধানমন্ত্রী বৈঠকে তিনি তিন দেশের তিন নারী প্রধানমন্ত্রীকে পাশে নিয়ে ছবি তুলেছেন। তাঁর একপাশে দাঁড়ানো ছিলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
ব্রিটেনে বাস করছি আজ ৩৮ বছর হয়ে গেল। ব্রিটিশ ওয়েলফেয়ার স্টেটের সকল সুযোগ সুবিধা ভোগ করছি এবং ব্রিটিশ সমাজে নানা অসঙ্গতি থাকা সত্ত্বেও নাগরিক অধিকারগুলো মোটামুটি ভোগ করতে পারছি। একটা আইনী শাসন ব্যবস্থার মধ্যে বাস করছি। নিজের দেশের মতো যখন তখন গুম বা হত্যার শিকার হওযার আশঙ্কা খুব কম। হলেও পুলিশ নিশ্চুপ থাকবে না। পৃথিবীর উন্নত-অনুন্নত নানা দেশ ঘুরেছি। এমনকি সেসব দেশ বিদেশী শাসন বা রাজতন্ত্র উচ্ছেদ করে প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছে সেসব দেশেও ঘুরেছি। 
কেন, আমার নিজের দেশও তো একটি রিপাবলিক বা প্রজাতন্ত্রী দেশ। শুধু প্রজাতন্ত্রী নয়, গণপ্রজাতন্ত্রী দেশ। এখানে কিংবা বাংলাদেশের মতো আরও কোন কোন তথাকথিত প্রজাতান্ত্রিক দেশে প্রজা সাধারণ কতটুকু নাগরিক অধিকার ভোগ করে? কতটুকু আইনের শাসনের নিরাপত্তার মধ্যে বাস করে? রাষ্ট্রের কতটুকু কল্যাণসেবা (welfare service) এসব দেশের মানুষ পায়? বাস্তবে আদৌ পায় না। 
ব্রিটেনের রানী কখনও চড়া গলায় কথা বলেন না। কাউকে হুমকি দেন না। এই সন্ত্রাসের ভয়াবহ হুমকির যুগেও এবারের ডায়মন্ড জুবিলি উৎসবেও দেখলাম, তিনি গণমানুষের কতটা কাছাকাছি চলে আসতে পারেন। আর আমাদের প্রজাতন্ত্রী দেশের রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীর কণ্ঠে সর্বদা শুধু হুমকি। ‘হতে দেব না’, ‘বরদাশত করা হবে না’, ‘টেনে নামাব’, ‘রক্ত গঙ্গা বইবে’ আরও কত কি। ব্রিটেনের রানীরও জনসাধারণের কাছে জবাবদিহিতা আছে। আমাদের প্রজাতন্ত্রী দেশের নেতানেত্রীদের নেই। তাঁরা গণতান্ত্রিক দেশের গণতান্ত্রিক নেতানেত্রীর মতো নন। স্বৈরতান্ত্রিক দেশের একনায়ক ও ডিক্টেটরদের মতো কথা বলেন, ক্ষমতার প্রতাপ দেখান অথচ দেশটির পরিচয় প্রজাতন্ত্র এবং নেতানেত্রীদের পরিচয় গণতন্ত্রী। 
আজকাল আবার প্রজাতন্ত্রের সঙ্গে নানা বিশেষণযুক্ত হয়েছে। যেমন গণপ্রজাতন্ত্র, ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইত্যাদি। এসব প্রজাতন্ত্রের ছোট-বড় অনেক দেশেই নাগরিক অধিকার, মানবাধিকার বঞ্চিত মানুষেরা কী দুঃসহ অবস্থা ও অত্যাচারের মধ্যে বাস করেন, রাষ্ট্র তার সকল দায়িত্ব এড়িয়ে কেমন ক্ষমতার দ- ঘোরায় নিপীড়িত মানুষের মাথায়, তার ছবি কি বাংলাদেশেও নেই? সারা জীবনের এই তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকেই বলতে ইচ্ছে করে গণকল্যাণকামী রাজতন্ত্র স্বৈরাচারী প্রজাতন্ত্রের চাইতে অনেক বেশি ভাল। তথাকথিত প্রজাতন্ত্রী শাসকদের চাইতে ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের রানী আমার কাছে অনেক বেশি শ্রদ্ধাভাজন। 

লন্ডন, ৫ জুন মঙ্গলবার, ২০১২ ॥

সোমবার, ৪ জুন, ২০১২

আওয়ামী লীগের শক্তি ও দুর্বলতার উৎস একই (২)




আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী
কবিয়াল রমেশ শীলের একটি গানের দুটি চরণ এখানে উদ্ধৃত করছি। ‘জনতা ছিনাইয়া আনে জয়/ নেতারা সেই জয় করে শুধু ক্ষয়।’
অর্থাৎ জনতা প্রবল যুদ্ধ করে গণশত্র“দের পরাজিত করে যে জয় ছিনিয়ে আনে, তাদের নেতারা ক্ষমতায় বসে নিজেদের ভুল, সুবিধাবাদিতা ও অযোগ্যতার জন্য সেই জয়কে পরাজয়ে পরিণত করে নিজেরা ডোবেন এবং দেশকেও ডোবান।
এই কথাটা যে কত বড় সত্য, তা আমার নাতিদীর্ঘ সাংবাদিক জীবনেও বহুবার প্রত্যক্ষ করেছি। আমাদের দেশের রাজনীতির সবচেয়ে বড় ট্রাজেডি হল, জনতা ভুল করে না। ভুল করেন নেতারা। তার মাশুল দিতে হয় আবার জনতাকেই। ১৯৫৪ সালে পাকিস্তান আমলে আমরা কী দেখেছি? স্বৈরাচারী মুসলিম লীগ-শাহীর বির“দ্ধে পূর্ব পাকিস্তানে যুক্তফ্রন্টের মাধ্যমে জনতার যে দুর্ভেদ্য ঐক্যের দুর্গ গড়ে উঠেছিল, তার ফলে নির্বাচনে এক ঐতিহাসিক জয়ের অধিকারী হয়েছিল যুক্তফ্রন্ট। জনতা লীগ-শাহীকে সমূলে উৎখাত করেছিল পূর্ব পাকিস্তানের মাটি থেকে। জনতা জয় অর্জনে ভুল করেনি। কিš‘ সেই জয়কে ধরে রাখতে পারলেন না নেতারা।
নির্বাচন জয়ের পর পরই মওলানা ভাসানী জনগণের বিজয়ের সাফল্যকে সংহত করার আগেই চলে গেলেন ইউরোপে তখনকার বাম নেতাদের পরামর্শে শান্তি সম্মেলনে যোগ দিতে। সোহরাওয়ার্দী অসু¯’ হয়ে বিদেশে চলে গেলেন চিকিৎসার জন্য। আর শেরেবাংলা? এত অভিজ্ঞ, প্রবীণ রাজনৈতিক নেতা হয়েও তিনি তখন ভাগ্নে নান্না মিয়া, ফরিদপুরের মোহন মিয়া, হামিদুল হক চৌধুরী প্রমুখ তখনকার সুবিধাবাদী নেতা দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে (বর্তমানের শেখ হাসিনার মতো) যুক্তফ্রন্টের শরিক দল আওয়ামী লীগকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে তার নিজের দল কৃষক শ্রমিক পার্টির মাত্র দু’জন সদস্যকে নিয়ে মন্ত্রিসভা গঠন করেন এবং নিজে মুখ্যমন্ত্রী হন। তৃতীয় সদস্য ছিলেন নেজামে ইসলাম পার্টির।
এই মন্ত্রিসভা গঠনে শরিক দলগুলোর সঙ্গে তিনি পরামর্শ করারও প্রয়োজন মনে করেননি। এই ত্রিসদস্য মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলেন সৈয়দ আজিজুল হক নান্না মিয়া, আবু হোসেন সরকার এবং নেজামে ইসলামের আশরাফ উদ্দীন চৌধুরী। যুক্তফ্রন্টের বড় অঙ্গদল হওয়া সত্ত্বেও প্রথমেই এই মার খাওয়ার পরও আওয়ামী লীগ গোড়ায় চুপ করে ছিল। কিš‘ তখনই যুক্তফ্রন্টে অনৈক্য ও দুর্বলতার সূত্রপাত হয়। যুক্তফ্রন্টের এই অনৈক্যের সুযোগ গ্রহণ করে তখনকার কেন্দ্রীয় রাজধানীতে ক্ষমতাসীন সেনা সমর্থিত কেন্দ্রীয় মুসলিম লীগ সরকার। বগুড়ার মোহাম্মদ আলী ছিলেন এই সরকারের অনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী।
শুর“ হয় পূর্ব পাকিস্তানে যুক্তফ্রন্ট সরকারকে উৎখাতের ষড়যন্ত্র। আদমজী জুট মিলে ও চন্দ্রঘোনা কাগজের মিলে ভাড়াটিয়া অবাঙালি শ্রমিক দ্বারা দাঙ্গা বাধানো হয় (শেখ হাসিনার এবারের ক্ষমতা গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে যেমন বিডিআর বিদ্রোহ ঘটানো হয়) এবং তার অজুহাতে হক মন্ত্রিসভাকে বরখাস্ত করার প্র¯‘তি নেয়া হয়। দাঙ্গা-হাঙ্গামা শুর“ হওয়ার কিছু আগে এই ষড়যন্ত্র টের পেয়ে হক সাহেব দ্র“ত তার মন্ত্রিসভা সম্প্রসারণ করেন এবং আওয়ামী লীগের আতাউর রহমান খান থেকে শেখ মুজিবুর রহমান পর্যন্ত অনেককে মন্ত্রিসভায় গ্রহণ করেন। কিš‘ তখন বড় বেশি দেরি হয়ে গেছে।
বিরাট নির্বাচন-বিজয়ের নেশায় শেরেবাংলা প্রথমে বুঝতে পারেননি, তার পরাজিত শত্র“পক্ষ কত বেশি শক্তির অধিকারী। তিনি কেবল নিজের নেতৃত্বের ক্যারিশমার জোরে নির্বাচনে জয়ী হননি। নির্বাচনে জয়ী হওয়ার কারণ জনতার ঐক্য এবং শক্তি। যুক্তফ্রন্ট এই ঐক্য ও শক্তির প্রতীক। এই যুক্তফন্টের ঐক্যে ফাটল ধরায় যুক্তফ্রন্ট শক্তিহীন হওয়ায় শত্র“পক্ষ আঘাত হানার সুযোগ পেয়েছে। তিনি তাই তাড়াতাড়ি আওয়ামী লীগকে মন্ত্রিসভায় এনে যুক্তফ্রন্টের ঐক্যের দ্বারা তখনকার পাকিস্তানের সেনা এবং মার্কিন সমর্থিত কেন্দ্রীয় মুসলিম লীগ সরকারের আঘাত প্রতিহত করতে চেয়েছিলেন। পারেননি। ক্ষমতায় বসতে না বসতেই তার মন্ত্রিসভাকে বরখাস্ত করা হয়। ফজলুল হক গৃহবন্দি হন। শেখ মুজিবুর রহমানসহ অসংখ্য নেতাকে গ্রেফতার করা হয়। পাকিস্তানে অঘোষিত সামরিক শাসনের সূচনা হয়। পূর্ব পাকিস্তানে জনতা যে ঐতিহাসিক বিজয় ছিনিয়ে এনেছিল, নেতাদের ভুলে, দুর্বলতায় এবং ক্ষমতার দ্বন্দ্বে সেই বিজয় ছিনতাই হয়ে যায়।
নেতারা কীভাবে জনতার আÍদান ও রক্তে অর্জিত জয়কে নিজেদের স্বার্থ, জেদ, সংকীর্ণ চিত্ততা, ক্ষমতার মোহ ও নেতৃত্বের কোন্দলে পরাজয়ে পরিণত করেন এবং জনতার আন্দোলন ও আÍত্যাগকে ব্যর্থ করে দেন, তার আরও অনেক উদাহরণ টানতে পারি। কিš‘ নিবন্ধটির পরিসর আর বাড়াতে চাই না বলে একটি উদাহরণেই ইতি টানলাম।
বাংলাদেশে এতকালের দীর্ঘ স্বৈরাচার ও সেনা-তাঁবেদার সরকারের বির“দ্ধে জনগণের আন্দোলনের পর ২০০৮ সালে ডিসেম্বর নির্বাচনে জনগণের ঐক্যের যে বিরাট ও ঐতিহাসিক বিজয়; সেই বিজয়ের তিন বছর না যেতেই বিজয়ের ফসল নষ্ট হতে বসা, সম্পূর্ণ পরাজিত ও বিধ্বস্ত বিএনপি এবং জামায়াতের এত শিগগিরই আবার ঘুরে দাঁড়ানো, ’৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বানচাল করার প্রকাশ্য তৎপরতা চালানোর সাহস দেখানো, তথাকথিত সুশীল সমাজ ও ড. ইউনূস-কর্তৃক সরকারবিরোধী দ্বিতীয় ফ্রন্ট আবার খোলা, জনমনে ক্ষোভ, আইন-শৃংখলা পরি¯ি’তির দ্র“ত অবনতি, তথাকথিত নিরপেক্ষ মিডিয়ার আবার বিভ্রান্তি সৃষ্টির চাতুরীর খেলা ইত্যাদি দেখে বুঝতে অসুবিধা হয় না জনতার দোষে নয়, নেতৃত্বের দোষে, নেতৃত্বের ভুলে আজ আবার দেশ ও জনগণ সর্বনাশের সম্মুখীন হতে যা”েছ। আমরা যারা আওয়ামী লীগের শুভাকাক্সক্ষী, আমাদের সম্ভবত রবীন্দ্রনাথের একটি গানের কলি আওড়ানো ছাড়া এখন আর কোন উপায় নেই।
‘আমার সকল নিয়ে বসে আছি সর্বনাশের আশায়।’
দেশের বর্তমান এই অব¯’ার জন্য সর্বাগ্রে দায়ী করতে হয় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারকেই। আর এই সরকারকে দায়ী করতে হলে দায়ী করতে হয় শেখ হাসিনাকেই। কারণ, দল এবং সরকার দুয়েরই তিনি এক”ছত্র নেত্রী। তার কথার বাইরে যাওয়ার ক্ষমতা কারও নেই। যাদের সে ক্ষমতা ছিল, তারা এখন দলে কোণঠাসা কিংবা দলছাড়া। তাদের বদলে দলে এবং সরকারে যারা ঘাঁটি গেড়ে বসেছে, তাদের অধিকাংশই অনেকের মতে, অযোগ্য ও অনভিজ্ঞ এবং ব্যারিস্টার রফিকুল হকের মতে বেকুব।
নির্বাচনে বিশাল বিজয় অতীতে জিন্নাহ ও হক সাহেবের মতো অনেক বড় মাপের নেতার মধ্যে যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করেছে, সেই একই ধরনের বিভ্রান্তি এ যুগে শেখ হাসিনার মধ্যেও সৃষ্টি করেছে বলে আমার ধারণা। ১৯৪৬ সালে পাকিস্তান ইস্যুতে অবিভক্ত বাংলায় অনুষ্ঠিত নির্বাচনে (সারা ভারতেই নির্বাচন হয়েছে) মুসলিম লীগের বিশাল বিজয়, এমনকি ফজলুল হকের দলেরও ভরাডুবি ঘটানো মি. জিন্নাহর মাথায় সম্ভবত এই ধারণাই জš§ দিয়েছিল যে, তিনি অপ্রতিদ্বন্দ্বী, তিনি অপরাজেয়। তার ব্যক্তিগত ক্যারিশমাই নির্বাচন জয়ের মূল কারণ।
এই ইল্যুশন থেকে পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল হওয়ার পর তিনি নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির সব নিয়ম-কানুন ভঙ্গ করে ডিক্টেটরসুলভ মনোভাবের পরিচয় দিতে শুর“ করেন। পাকিস্তানের প্রথম মন্ত্রিসভায় তিনি ফজলুল হক, সোহরাওয়ার্দী প্রমুখ অভিজ্ঞ ও যোগ্য বাঙালি নেতাকে দেশ গঠনের কাজে না লাগিয়ে তাদের দূরে সরিয়ে রাখেন এবং সাবেক আমলা চৌধুরী মোহাম্মদ আলী, মোশতাক আহমদ খুরমানি, টাটা কোম্পানির প্রাক্তন কর্মচারী গোলাম মোহাম্মদ প্রমুখকে এনে মন্ত্রী বানান। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তান থেকে যে সব রাজনীতিককে লিয়াকত-মন্ত্রিসভায় গ্রহণ করা হয়, তাদের অধিকাংশই ছিলেন ব্যক্তিত্বহীন, জো হুজুরের দল। সিভিল ও মিলিটারি ব্যুরোক্র্যাসির ক্ষমতা দখলের চক্রান্ত মোকাবেলা করার ব্যাপারে এরা ছিল একেবারেই অদক্ষ ও অযোগ্য।
জিন্নাহর মৃত্যু ও লিয়াকত হত্যার পর এদের হাত থেকে ক্ষমতা ছিনিয়ে নিতে এই সিভিল মিলিটারি ব্যুরোক্র্যাসির তিন বছর সময়ও লাগেনি। এই রাজনীতিকরা খুব দ্র“ত মিলিটারির শাসকদেরও আজ্ঞাবহ হয়েছে। জিন্নাহ জীবিত থাকতেই দেখে গেছেন, যে বাঙালিরা ১৯৪৬ সালে তার মনোনীত ‘কলাগাছকেও’ ভোট দিতে দ্বিধা করেনি; তিন বছর না যেতেই সেই বাঙালিরা রাষ্ট্রভাষা সংক্রান্ত তার হুকুমের বির“দ্ধে গর্জে উঠেছে। জিন্নাহ আর কয়েকটি বছর বেঁচে থাকলে বাংলাদেশে তার দলের পতন এবং হক সাহেবের অভ্যুত্থান দেখে যেতেন। 
১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনে বিশাল জয় শেরেবাংলার মতো নেতাকেও বিভ্রান্ত করেছে। তিনি পরাজিত শত্র“র ক্ষমতা ও চক্রান্তের শক্তিকে খাটো করে দেখেছেন। ভেবেছেন, তিনি তার বিশাল ব্যক্তিত্বের ক্যারিশমা দিয়েই যুক্তফ্রন্টের নামে তার নিজের দল কৃষক শ্রমিক পার্টিকে ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখতে পারবেন। তিনি তার শরিক দলগুলোÑ বিশেষ করে যুক্তফ্রন্টের বৃহত্তম শরিক আওয়ামী লীগকে প্রথমে উপেক্ষা করে নিজের পেটোয়া ব্যক্তিদের দ্বারা একটি পকেট মন্ত্রিসভা গঠন করেন। এই পকেট মন্ত্রিসভাই যুক্তফ্রন্টে অনৈক্য ও শত্র“ শিবিরে উৎসাহের সূত্রপাত ঘটায়। 
১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন-বিজয়ী হয়ে ক্ষমতায় বসার পরই আদমজী জুট মিল ও চন্দ্রঘোনা পেপার মিলে যে রক্তক্ষয়ী ভয়াবহ দাঙ্গা বাধানো হয়, তার উদ্দেশ্যের সঙ্গে ২০০৯ সালে স্বাধীন বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ বা মহাজোট নির্বাচনে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় বসার সঙ্গে সঙ্গেই যে বহু জীবনঘাতী বিডিআর বিদ্রোহ ঘটানো হয় তার উদ্দেশ্যের কোন পার্থক্য নেই। এ সময় বাংলাদেশ একটি প্রদেশ হিসেবে থাকলে এবং শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর বদলে মুখ্যমন্ত্রী থাকলে ওই বিডিআর বিদ্রোহকে অজুহাত হিসেবে দেখিয়ে কেন্দ্রীয় সরকার তাকে বরখাস্ত করত। বাংলাদেশের স্বাধীন স্ট্যাটাস শেখ হাসিনাকে রক্ষা করেছে। 
আমার ধারণা, নির্বাচনে বিশাল বিজয়ই শেরেবাংলার মতো শেখ হাসিনাকে এই ধারণা দিয়েছে যে, তিনি তার শত্র“পক্ষকে সম্পূর্ণ কুপোকাত করেছেন। তার জনপ্রিয়তা এবং নেতৃত্বের ক্যারিশমাই তাকে ক্ষমতায় রাখবে এবং একটি পকেট মন্ত্রিসভা দ্বারাই তিনি অসম্ভব শক্তিশালী দেশী-বিদেশী চক্রান্ত ব্যর্থ করতে পারবেন এবং দেশের সব সমস্যার মোকাবেলা করে জনপ্রিয়তা ধরে রাখতে পারবেন। সাড়ে তিন বছর ক্ষমতায় থাকার পর তিনি আজ তার এই ধারণাটি যে ভুল, তা বুঝতে পারছেন কিনা তা আমি জানি না। অনেক সাফল্য থাকা সত্ত্বেও তার সরকার আজ একটি ব্যর্থ সরকার হিসেবে পরিচিত হতে চলেছে।
বিডিআর বিদ্রোহের পরই শেখ হাসিনার উপলব্ধি করা উচিত ছিল, কেবল নির্বাচন-বিজয় তার সরকারের রক্ষাকবচ নয়। দেশ এবং গণতন্ত্র রক্ষায় তাকে বহু ফ্রন্টে অসমযুদ্ধে লিপ্ত হতে হবে। তা মোকাবেলা করার মতো দক্ষ মন্ত্রিসভা চাই। তিনি দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার বদলে অদক্ষতা ও আনুগত্যকে বেশি গুর“ত্ব দিয়ে মন্ত্রিসভা গঠন করেছেন এবং এখন তার ফল ভোগ করছেন। নির্বাচিত মন্ত্রীদের মাথায় তিনি আবার অনির্বাচিত উপদেষ্টাদের বসিয়ে দিয়েছেন। তা শুধু অসাংবিধানিক ও অগণতান্ত্রিক ব্যব¯’া নয়, একটি ব্যর্থ দ্বৈত শাসন বলেও প্রমাণিত হয়েছে।
সরকার যেমন অদক্ষ ও দুর্বল, তেমনি বর্তমানের আওয়ামী লীগও। দলের সাংগঠনিক কাঠামো বলতে এখন কিছু নেই এবং এত দুর্বল নেতৃত্বও আওয়ামী লীগের সুদীর্ঘ অর্ধশতাব্দীর বেশি সময়ের জীবনে দেখা যায়নি। দল এবং সরকারের সব ক্ষমতা নিজের হাতে কেন্দ্রীভূত করে শেখ হাসিনা প্রমাণ করেছেন, সরকার ও দলের বর্তমান সব দুর্বলতার জন্যও তিনিই দায়ী। তিনি নিজেকে দল ও সরকারের শক্তির উৎস থেকে দুর্বলতার উৎসেও পরিণত করেছেন। আর দেড় বছরও বাকি নেই। তিনি যদি এ সময়ের মধ্যে নিজেকে সংশোধন করে আবার দল ও সরকারের শক্তির উৎস হয়ে উঠতে না পারেন, তাহলে শুধু এই দল ও সরকারের নয়, দেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎও অনিশ্চিত। (সমাপ্ত)
লন্ডন, ৩ জুন, রোববার ২০১২

অ-রূপকথার যুগের এক রানির গল্প

আমি রানি ভিক্টোরিয়াকে দেখিনি, কিন্তু রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথকে দেখেছি। একবার নয়, কয়েকবার দেখেছি। দূর থেকে দেখেছি দুবার। সামনাসামনি দেখেছি দুবার। তাঁর সঙ্গে শেক হ্যান্ডও করেছি একবার, একেবারে তাঁর বাকিংহাম প্যালেসের দরবারকক্ষে দাঁড়িয়ে। ভিক্টোরিয়ার মতোই তিনি অল্প বয়সে সিংহাসনে বসেছেন। ভিক্টোরিয়ার মতোই দীর্ঘ জীবন পেয়েছেন এবং এ বছর তাঁর রাজত্বের ৬০ বছর পূর্ণ হলো। এই জুন মাসের গোড়ায় আজ কদিন ধরে চলছে তাঁর সরকারি ডায়মন্ড জুবিলি উৎসব। আজ চার দিন ধরে (২ থেকে ৫ জুন) সারা লন্ডন শহর উৎসব ও উল্লাসমুখর (৪ ও ৫ জুন সরকারি ছুটি)।
১৮৩৮ সালে মাত্র ১৯ বছর বয়সে ভিক্টোরিয়া ব্রিটিশ সিংহাসনে বসেন। সেটা ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের উদয়কাল। রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথও ১৯৫২ সালে যখন পিতা ষষ্ঠ জর্জের আকস্মিক মৃত্যুর পর সিংহাসনে বসেন, তখন তাঁর বয়স ২৬ বছর। সদ্যঃবিবাহিতা। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের তখন পড়ন্তকাল। ভিক্টোরিয়াকে সাম্রাজ্য শাসন করতে হয়নি। তখন ব্রিটিশ সাম্রাজ্য অসীম শক্তিশালী। সাম্রাজ্যের সম্পদ ও শক্তিতেই সাম্রাজ্য চলেছে। কিন্তু দ্বিতীয় এলিজাবেথ যখন সিংহাসনে বসেছেন, তখন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ভাঙন শুরু হয়ে গেছে। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধোত্তর সারা বিশ্ব টালমাটাল। বিশ্বশক্তির আসন থেকে ব্রিটেন নেমে যাচ্ছে। এই সময় ব্রিটেনের রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিস্থাপকতা রক্ষা এবং এশিয়া ও আফ্রিকার সদ্য হাতছাড়া উপনিবেশগুলো ব্রিটেনের নৈতিক প্রভাব রক্ষার কাজে একজন নিয়মতান্ত্রিক রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে দ্বিতীয় এলিজাবেথ সেই তরুণ বয়সেই যে ধৈর্য, সাহস ও প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়েছেন, তা অতুলনীয়।
১৯৫২ সালে আমি ঢাকায় কলেজের ছাত্র এবং দৈনিক সংবাদে খণ্ডকালীন সাংবাদিক। এ সময় একদিন খবর এলো, রাজা ষষ্ঠ জর্জ মারা গেছেন। তাঁর পুত্রসন্তান নেই। দুই মেয়ে এলিজাবেথ ও মার্গারেট। এলিজাবেথ রানি হচ্ছেন। ২৬ বছরের তরুণী রানি। সুন্দরী তো বটেই। তাঁর স্বামী গ্রিক রাজবংশের প্রিন্স ফিলিপ (ডিউক অব এডিনবরা) দীর্ঘদেহী, সুশ্রী পুরুষ। আমি ব্রিটিশ আমলে বাংলাদেশের এক রাজনৈতিক পরিবারে জন্মেছি। আমার বাবা ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে জেলে গেছেন। আমি যখন স্কুলে নিচের ক্লাসে পড়ি, তখন সারা অবিভক্ত ভারত ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে উত্তাল। আমরা ছাত্ররা রাস্তায় নেমে স্লোগান দিচ্ছি- 'ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ধ্বংস হোক', 'হিন্দু-মুসলিম এক আওয়াজ/খতম করো ব্রিটিশরাজ' ইত্যাদি। স্বভাবতই উপমহাদেশে ব্রিটিশরাজ খতম হওয়ার পরও ব্রিটিশবিরোধী চেতনা মনে জাগ্রত ছিল।
তাই ব্রিটেনের কোন রাজা মারা গেলেন, কে নতুন রাজা বা রানি হলেন, তা নিয়ে তখন মাথা ঘামাইনি। কেবল নতুন রানির রূপসী চেহারা অনেকের মতো আমার তরুণ মনেও একটা ছাপ ফেলেছিল। তারপর এই রানিকে চাক্ষুষ দেখি ১৯৫৯ কি ১৯৬০ সালে। তখন তাঁর ভরযৌবন। তিনি তখন শুধু ব্রিটেনের রানি নন, কমনওয়েলথ-প্রধানও। পাকিস্তানে আইয়ুবের সামরিক শাসন চলছে। রানি পাকিস্তান সফরে এসেছেন। পশ্চিম পাকিস্তান সফর শেষে পূর্ব পাকিস্তানেও এসেছেন। রানির এই সফর উপলক্ষ করেই তেজগাঁওয়ের পুরনো বিমানবন্দর থেকে ঢাকা শহরে আসার প্রশস্ত সড়কটি তৈরি করা হয়। রমনায় সাবেক মুখ্যমন্ত্রীর বাড়িটি ভেঙে রাতারাতি রানির বাসোপযোগী বিরাট দ্বিতল ভবন গড়ে ওঠে। আইয়ুব ও ইয়াহিয়ার আমলে এটি ঢাকায় প্রেসিডেন্ট হাউস হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রথম নাম হয় 'গণভবন'।
তখন ছিলাম একেবারেই জুনিয়র সাংবাদিক। রানির জন্য দেওয়া ঢাকার কোনো সরকারি বা বেসরকারি পার্টিতেই দাওয়াতের কার্ড পাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করিনি। রমনা গ্রীনের সিভিক রিসেপশনে রানি ও ডিউককে একঝলক দেখার সৌভাগ্য অর্জন করেছি। তাও বহু দূর থেকে। একেবারে কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য হলো এক দুপুরে, হাটখোলা রোড ও রামকৃষ্ণ মিশন রোডের ক্রসিংয়ে ফুটপাথে দাঁড়িয়ে ('ইত্তেফাক'-এর পুরনো অফিসের কোনায়)।
রাণী ও ডিউক ওই সফরের সময় সদলবলে গিয়েছিলেন নারায়ণগঞ্জের কাছে আদমজীনগরে আদমজী জুট মিল পরিদর্শনে। সেখান থেকে এই পথেই তিনি ঢাকা শহরে ফিরে আসবেন। সেদিন প্রচণ্ড গরম। মাথার চাঁদি ফাটানো রোদের তাপ। তবু হাজার হাজার লোক হাটখোলা রোডের দুপাশের ফুটপাথে জড়ো হয়েছে রানিকে একনজর দেখার জন্য। নিরাপত্তার কঠোর বেষ্টনী ভেঙে পড়ছে। আমিও সেই জনতার ভিড়ে দাঁড়িয়ে শরীর ঝলসানো রোদের মধ্যে অপেক্ষা করেছি রানিকে খুব কাছ থেকে একনজর দেখার আশায়।
একটা ছাদখোলা বড় পিকআপ ধরনের গাড়িতে রানি দাঁড়িয়ে আছেন। পথিপাশ্র্বের জনতার অভিবাদন গ্রহণ করার জন্য তিনি হাত কপালে ঠেকিয়ে রেখেছেন। গাড়িতে তাঁর পেছনে আরো লোক। সিকিউরিটির লোক, এমনকি ডিউকও বসে আছেন। তিনি কুইনের কনসোর্ট। রানির পাশে দাঁড়িয়ে থাকার কথা ছিল। শুনলাম, সেই আদমজী থেকে রানি এভাবে গাড়িতে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর মাথার ওপর একটা ছাতি ধরাও হয়নি। অন্তত আমার মনে পড়ছে না। শীতের দেশের রানি। বাংলাদেশের এই প্রচণ্ড গরমে প্রখর রোদে দিনি আদমজী থেকে ঢাকা- এই ১০ মাইল পথ রোদ মাথায় খোলা গাড়িতে দাঁড়িয়ে আছেন, এই দৃশ্যটি এখনো আমার চোখে ভাসে। এখন জানি, এ যুগে রাজা-রানি হওয়াটা যতটা সুখের বলে আমরা ভাবি, তা ততটা সুখের নয়।
ব্রিটেনের মহামান্যা রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথকে একেবারে মুখোমুখি দেখার এবং তাঁর সঙ্গে শেক হ্যান্ড করার বিরল সৌভাগ্যের কথাটা বলি। এখন তো হচ্ছে তাঁর ডায়মন্ড জুবিলি উৎসব; গত শনিবার (২ জুন) ইপসমে ডার্বির ঘোড়দৌড় দেখার মধ্য দিয়ে যে উৎসবের শুরু, তা শেষ হচ্ছে আজ মঙ্গলবার (৫ জুন) লন্ডনের সেন্ট পলস গির্জায় থ্যাংকস গিভিং সার্ভিসের মধ্য দিয়ে। মাঝখানে দুদিন রবি ও সোমবার শুধু লন্ডন নয়, সারা ব্রিটেন আনন্দে-উল্লাসে, আলোকসজ্জায় মেতে উঠেছিল। টেমস নদীতে নৌমহড়া ও রানির নৌবিহার দেখতে লাখ লাখ লোকের সমাবেশ চোখে দেখার মতো ঘটনা। ব্রিটেনের মানুষ যে এই রানিকে এবং রাজতন্ত্রকে এখনো ভালোবাসে, এটা তার প্রমাণ।
যা হোক, আমি বলছি রানির আগের সিলভার জুবিলির সময়ের কথা। আমি তখন লন্ডনে এসেছি বছর কয়েক হয়। একটা বাংলা সাপ্তাহিক কাগজ সম্পাদনা করি। বাকিংহাম প্যালেসে ব্রিটেনের এথনিক কমিউনিটির প্রতিনিধি ও এথনিক কাগজের সম্পাদকদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে রানির সঙ্গে দেখা করার জন্য। সৌভাগ্যক্রমে আমিও একটা কার্ড পেলাম। কিন্তু প্যালেসে ঢোকার জন্য যে স্যুট-টাই পরার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তা আমার নেই। আমার গাড়িতে সামনের কাচে লাগানোর জন্য স্টিকার এবং সিকিউরিটি পেপার দেওয়া হয়েছে। আমার তো গাড়িই নেই।
প্রবীণ সাহিত্যিক ও সাংবাদিক আবদুল মতিন তখন লন্ডনে ইউকেআইএএসের (ইউনাইটেড কিংডম ইমিগ্রেশন অ্যাডভাইজরি সার্ভিস) অফিসে চাকরি করেন। তিনি বুদ্ধি বাতলে দিলেন। কভেন গার্ডেনের কাছে মোস ব্রাদার্স বলে একটা দোকান আছে; তারা দামি স্যুট-টাই ভাড়া দেয়। আমি এক দিনের জন্য রানির দরবারে যাওয়ার ড্রেসকোড অনুযায়ী ড্রেস ভাড়া করতে পারি। তারপর বন্ধুবান্ধবের কাছ থেকে গাড়ি ধার পাওয়া না গেলে ট্রাফালগার স্কয়ারের কাছ থেকে একটা ক্যাব (ব্ল্যাক ট্যাক্সি নয়) ভাড়া করে তাতে স্টিকার ইত্যাদি লাগিয়ে প্যালেসে ঢুকলেই চলবে। ক্যাব ড্রাইভারকেও সেভাবেই শিখিয়ে-পড়িয়ে নিতে হবে। আমি মতিন ভাইয়ের পরামর্শ মেনে সেবার এভাবেই বাকিংহাম প্যালেসে ঢুকেছিলাম।
অনুষ্ঠানের প্রথমেই ছিল দরবারকক্ষে রানির সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎ। রানি আনুষ্ঠানিক পোশাক পরে তাঁর আসনের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। আমরা সারি বেঁধে দাঁড়িয়েছি। এক এক করে তাঁর সামনে গিয়ে করমর্দন করে ফিরে আসছি। আমি আনাড়ি। রানির সঙ্গে করমর্দন (আসলে তাঁর গ্লাভস পরা আঙুল ছোঁয়া) সেরে ফিরে আসতে যাচ্ছি, কাছেই দাঁড়িয়ে থাকা এক প্যালেস প্রহরী আমাকে পেছন ফিরতে দিলেন না। নিজের ভুল বুঝতে পারলাম। রানির দিকে পেছন ফিরে দাঁড়াতে নেই। তাঁর দিকে মাথা নিচু রেখে এবং একপা-দুপা করে পেছনে হেঁটে এসে তারপর পেছন ঘুরতে হবে। এই ভুলটা করে লজ্জা পেয়েছিলাম। দেখি, পাশে দাঁড়ানো প্রিন্স ফিলিপ মৃদু মৃদু হাসছেন।
দরবার হলের বাইরে প্রশস্ত বারান্দায় টেবিলে স্ন্যাকস ও পানীয় সাজানো। দরবার হল থেকে ফিরে এসে সবাই তা খাচ্ছেন। কিছুক্ষণের মধ্যে রানি এই আমন্ত্রিতদের ভিড়ের কাছে চলে আসেন। এবার তাঁর একেবারে সাদাসিধে পোশাক। সবার সঙ্গে হেসে হেসে কথা বলছেন; সেই রাজকীয় দূরত্ব আর নেই। সেই সমাবেশে সাদা-কালো সব বর্ণের নরনারী ছিলেন। তাঁরা কেউ কেউ রানির গায়ে হাত দিয়ে পর্যন্ত কথা বলছেন। কেউ কেউ গায়ে গা লাগিয়ে কথা বলছেন। তিনি কিছু মনে করছেন না। খুবই অন্তরঙ্গভাবে কথা বলছেন। আমাদের মতো দেশগুলোর প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রীদের এত কাছে গিয়ে দাঁড়ানো যায় না। এখন না হয় সিকিউরিটির কড়াকড়ির যুগ। কিন্তু এত সিকিউরিটির কড়াকড়ি যখন ছিল না, তখনো অনেক প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্ট-প্রধানমন্ত্রীর কাছে ঘেঁষা সহজ ছিল না।
প্রিন্স ফিলিপকে ঘিরেও তখন অনেক ভিড়। আমি সেই ভিড় এড়িয়ে রানির কাছে এগোনোর চেষ্টা করলাম। ইচ্ছা তাঁর সঙ্গে একটু কথা বলি। অনেক কষ্টে তাঁর একটু কাছাকাছি গিয়ে বললাম, হার ম্যাজেস্টি, আই অ্যাম ফ্রম বাংলাদেশ। বিস্ময়ের কথা। রানি বাংলাদেশ কথাটি শুনেই আমার দিকে ফিরে তাকালেন। বললেন, 'আর ইউ? হোয়াট'স দ্য নিউজ অব ইওর কান্ট্রি?' বাংলাদেশে তখন জেনারেল এরশাদের সামরিক শাসন চলছে। দেশটিতে যে এখনো গণতন্ত্র নেই, সে কথাই রাণীকে বলতে যাচ্ছিলাম। অদূরেই দাঁড়িয়ে ছিলেন দোহা সাহেব। শামসুদ্দোহা। তখন ব্রিটেনে বাংলাদেশের হাইকমিশনার। তিনি আমার কথায় বাধা দিতে রানিকে অন্য কী বলতে যাচ্ছিলেন। রাণী স্মিত হাসি হেসে তাঁকে বললেন, 'আই অ্যাম লিসেনিং টু হিম।' বলে আমাকে দেখালেন। আমি অবশ্য আর কথা বলিনি। দোহা সাহেবও চুপ।
রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথকে তার পরও একবার আমি কিছুটা কাছে থেকে দেখেছি। এ বছরেও বাকিংহাম প্যালেসে আমন্ত্রণ পেয়েছিলাম। যেতে পারিনি। শারীরিকভাবে অসুস্থ ছিলাম। এ মাসে তাঁর ডায়মন্ড জুবিলি উপলক্ষে চার দিন ধরে লন্ডনসহ সারা যুক্তরাজ্যে যে আনন্দ-উল্লাসের প্লাবন দেখলাম, তাতে বিস্মিত হয়ে ভাবছি, যেখানে নির্বাচিত ক্যামেরন সরকারের জনপ্রিয়তা এখন প্রায় শূন্যের কোঠায়, সেখানে ৬০ বছর ধরে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের জনপ্রিয়তা এখনো তুঙ্গে। রহস্যটা কোথায়?
আমি রাজতন্ত্র পছন্দ করি না। কিন্তু ব্রিটিশ মনার্কিকে রাজতন্ত্র বলা চলে না। এটা একটা বিস্ময়কর ইনস্টিটিউশন। রাজতন্ত্র ও প্রজাতন্ত্রের সম্মিলনে এটা একটা মানবিক প্রতিষ্ঠান। এটা ঠিক গণতন্ত্র নয়, কিন্তু গণতন্ত্রের মাথার ওপর একটি নির্ভরযোগ্য ছাতা। ব্রিটিশ মনার্কের মাথায় মুকুট আছে, ক্ষমতা নেই। তাঁরা প্রজাদের শাসন করেন না, সার্ভিস দেন। রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ ৬০ বছর ধরে ব্রিটিশ ও কমনওয়েলথের জনগণকে নিরবচ্ছিন্নভাবে সেই সেবা দিয়ে এক গৌরবোজ্জ্বল রেকর্ড সৃষ্টি করেছেন।
প্রাচীনকালে হতো, এখন আর ব্রিটিশ রাজা-রানির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ বা ক্যু হয় না। আরব স্প্রিং তো নয়ই। ব্রিটিশ রাজা বা রানিরাও আবার নির্বাচিত সরকারকে বরখাস্ত করেন না। যেমন করা হয়ে থাকে এশিয়া-আফ্রিকার বহু তথাকথিত প্রজাতান্ত্রিক দেশে। অতীতের সাম্রাজ্যবাদী শাসনের লিগ্যাসি বহন করে ব্রিটিশ রাজতন্ত্রও। কিন্তু রাজতন্ত্রবিহীন, গণতন্ত্রের লেবেল আঁটা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীদের বর্তমান চেহারার কাছে ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের চেহারা এখনো অনেক বেশি মানবিক। তাই কৈশোরে যেখানে স্লোগান দিয়েছি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ ধ্বংস হোক, সেখানে এখন মনে মনে বলি (স্লোগান দেওয়ার বয়স নেই), ব্রিটিশ গণতন্ত্র দীর্ঘজীবী হোক। এই গণতন্ত্রের সবচেয়ে উজ্জ্বল হিউম্যানফেস ব্রিটিশ রাজতন্ত্র।

লন্ডন, ৪ জুন সোমবার, ২০১২

শুক্রবার, ১ জুন, ২০১২

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী
হরতালকে এই দুর্নাম থেকে মুক্ত করতে হবে। বাকস্বাধীনতা বা সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিয়ে বাড়াবাড়ি হলেও যেমন কেউ বলে না, এই স্বাধীনতা বাতিল করা হোক, হরতালের বেলাতেও তেমনি তার অপব্যবহারের বাড়াবাড়িতে হরতাল নিষিদ্ধ করা অযৌক্তিক। তাতে নাগরিক অধিকার হরণ করা হবে, জনগণের দাবি আদায় এবং বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ জানানোর শান্তিপূর্ণ পন্থাগুলো রোধ করা হবে

ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ড্যান মজিনা হঠাৎ একটি বোমা ফাটিয়েছেন। অবশ্য কথার বোমা। আমাদের মুরবি্ব পশ্চিমা দেশগুলোর রাষ্ট্রদূতরা প্রায়ই এ ধরনের বোমা ফাটিয়ে থাকেন। এই বোমা ফাটানোর সঙ্গে তাদের দেশের কথা ও কাজের কোনো সঙ্গতি থাক আর না-ই থাক। মজিনা সাহেব ঠাস করে বলে ফেলেছেন, 'আমি হরতালকে ঘৃণা করি।' যদি তিনি বলতেন, আমি বাংলাদেশের সহিংস হরতালগুলোকে ঘৃণা করি, তাহলে এ কথার একটা অর্থ ছিল। কিন্তু তিনি যখন বলেন, একেবারে হরতালকেই তিনি ঘৃণা করেন, তখন প্রশ্ন উঠবে, যে হরতাল জনসাধারণের শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ প্রদর্শনের গণতান্ত্রিক অধিকার, সেই গণতান্ত্রিক অধিকার তথা গনতন্ত্রকেই তিনি কি ঘৃণা করেন?

মজিনা সাহেবের কথা শুনে আওয়ামী লীগের একশ্রেণীর নেতাকর্মী খুশি হয়েছেন। তারা ধরে নিয়েছেন, বাংলাদেশের সাম্প্রতিক হরতালগুলো যখন বিএনপি ডেকেছে, তখন মার্কিন রাষ্ট্রদূত তাদের ডাকা হরতালের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করে আসলে বিএনপির প্রতি আমেরিকার অসন্তোষের কথাই ব্যক্ত করেছেন। অর্থাৎ মার্কিন সমর্থন আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষে। সুতরাং আগামী নির্বাচনে বর্তমান সরকারের মার্কিন সমর্থন হারানোর ভয় নেই।
এ ধরনের ধারণা বোকার স্বর্গে বাস করার সমতুল্য। মজিনা সাহেব পুরনো ঘুঘু কূটনীতিক। তার পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি মাত্র বাংলাদেশ সফর করে গেছেন। এ সফরের সময় তার সব কথাবার্তা হাসিনা সরকারকে খুশি করেনি। ঠিক এই সময় মার্কিন রাষ্ট্রদূত এমন একটি কথা বলবেন, যা বাংলাদেশের কোনো একটি দলের প্রতি পক্ষপাতিত্ব বোঝাবে এটা চিন্তা করা পাগলামি। আর যেখানে বাংলাদেশ ও আওয়ামী লীগের বন্ধু বলে কীর্তিত ভারতের অর্থমন্ত্রী প্রণব মুখার্জি পর্যন্ত 'তারা বাংলাদেশের কোনো একটি বিশেষ দলের বন্ধু নন' বলে খালেদা জিয়াকে আশ্বস্ত করে গেছেন, সেখানে ওয়াশিংটনের দূত আগ বাড়িয়ে পরোক্ষভাবেও সরাসরি বাংলাদেশের একটি দলের সরকারের পক্ষে তার বক্তব্যটির অর্থ করা যাবে_ এমন কথা বলবেন কি? বাংলাদেশ সম্পর্কে দিলি্ল-ওয়াশিংটন অক্সিসের বর্তমান মনোভাব কি অভিন্ন নয়?
মজিনা সাহেব যদি বলতেন তিনি হরতালকে ঘৃণা করেন না, হরতালের সঙ্গে বাংলাদেশে সাম্প্রতিককালে যুক্ত হত্যা, রক্তপাত, অগি্নকাণ্ড_ এক কথায় সন্ত্রাসকে ঘৃণা করেন, তাহলে তাকে সাধুবাদ দেওয়া যেত। কিন্তু তিনি এক কথায় গোটা হরতালের প্রতি ঘৃণা প্রকাশ করে সকল দেশের জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকারের একটি অপরিহার্য অংশের প্রতি কার্যত ঘৃণা প্রকাশ করেছেন বলা চলে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখনও একটি গণতান্ত্রিক দেশ। ধর্মঘট বিক্ষোভ মিছিল মিটিং করা এখনও মার্কিন জনগণের একটি সাংবিধানিক অধিকার। এই অধিকারের কোনো একটি অংশের প্রতিও তিনি ঘৃণা প্রকাশ করতে পারেন কি?
বাংলাদেশে বর্তমানে হরতালবিরোধী একটি কঠিন মনোভাব সাধারণ মানুষের মধ্যে দানা বেঁধে উঠেছে। এটা আসলে হরতালের বিরোধিতা নয়, হরতালকে কেন্দ্র করে যে হত্যা, অগি্নকাণ্ড, সন্ত্রাস সৃষ্টি করা হয়, তাতে জনজীবনে যে ভয়াবহ দুর্ভোগ দেখা দেয়, তাতে স্বভাবতই মানুষ ক্ষুব্ধ এবং ত্রুক্রদ্ধ। একজন নিরীহ বাসচালক, যিনি হরতালের দিন বাস চালাননি, বাসটি পার্কিংয়ে রেখে তার ভেতরে ঘুমাচ্ছিলেন, তার গাড়িতে আগুন লাগিয়ে নৃশংসভাবে তাকে পুড়িয়ে মারা তো হরতাল নয়; তা বর্বরতা। গরিব রিকশাচালক যে পেটের দায়ে রাস্তায় তার গাড়ি বের করেছে, তাকে গাড়িসহ পুড়িয়ে মারা তো শাস্তিযোগ্য অপরাধ। বিএনপি বা আওয়ামী লীগের বা যে কোনো দলের যেমন হরতাল ডাকার অধিকার আছে, তেমনি একজন নাগরিকেরও অধিকার আছে সে ডাকে সাড়া দেওয়ার অথবা না দেওয়ার। সে ক্ষেত্রে সাড়া না দিলে তাকে বল প্রয়োগে সাড়া দিতে বাধ্য করা হলে তা জঘন্য অপরাধ; গণতান্ত্রিক অধিকারের অপপ্রয়োগ। সবচেয়ে বড় কথা তা হরতাল নয়, তা সন্ত্রাস।
আমরা যেমন চাই রাজনীতি বর্জন নয়, চাই রাজনীতিকে সন্ত্রাস ও দুর্নীতিমুক্ত করা। তেমনি হরতালও বর্জন নয়, হরতালকে সন্ত্রাসমুক্ত করা দরকার। আমরা সকলেই বলি, দেশের রাজনীতি এখন কালো টাকার মালিক এবং সন্ত্রাসীদের কবলে চলে গেছে। তাই বলে কি রাজনীতি বাতিল করে দিতে হবে? না রাজনীতিকে কালো টাকা ও সন্ত্রাসের কবল থেকে মুক্ত করতে হবে? রাজনীতিবর্জিত গণতন্ত্র কি কখনও সক্রিয় ও সচল থাকতে পারে? সামরিক শাসকরা সকল সময় দেশের সকল দুর্ভোগের দায় রাজনীতির ওপর চাপান এবং রাজনৈতিক দলগুলো নিষিদ্ধ করে দেন। তারপর কিছুদিনের মধ্যে তারা নিজেরাই রাজনীতিক সাজেন এবং নিজেদেরই রাজনৈতিক দল গঠন করেন। প্রমাণিত হয়েছে, রাজনীতিকে কলুষিত করে সামরিক শাসন, স্বৈরাচার, কালো টাকা ও সন্ত্রাস। রাজনীতিকে এর কবলমুক্ত করা গেলে রাজনীতিই গণতন্ত্র ও গণঅধিকার রক্ষার শ্রেষ্ঠতম বাহন।
হরতাল সম্পর্কেও একই কথা বলা যায়। আধুনিক গণতন্ত্রে নাগরিকদের অধিকার রক্ষা ও দাবি আদায়ের যে ক'টি শান্তিপূর্ণ পন্থা আছে, তার মধ্যে হরতাল ও ধর্মঘট একটি শ্রেষ্ঠ পন্থা। বাকস্বাধীনতা, মিটিং-মিছিল করার স্বাধীনতা, বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ জাগানোর অধিকার ইত্যাদি নানা নাগরিক অধিকারের মধ্যে হরতালও একটি। হরতালের অধিকারকে বাতিল করা হলে একটি বড় নাগরিক অধিকারই হরণ করা হবে। এ জন্য রাজনীতির মতোই হরতাল বেআইনি করা নয়, হরতালকে সন্ত্রাসমুক্ত করতে হবে। সন্ত্রাস দমন না করে হরতাল বাতিল বা নিষিদ্ধ করা হলে তা কাজ দেবে না। অন্য নামে সন্ত্রাসী হরতাল চালানো হবে। শর্ষের ভেতর থেকে ভূত না তাড়ালে শর্ষেকে শাস্তি দিয়ে লাভ নেই।
আমাদের দেশের একশ্রেণীর মিডিয়া, একশ্রেণীর ভদ্রলোক, এমনকি ব্যবসায়ীদের মধ্যে হরতাল নিষিদ্ধ করার জিগির উঠেছে। হরতালে দেশের জনজীবনে যে বিরাট দুর্ভোগ দেখা দেয়, ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষতি হয়, অর্থনীতির সর্বনাশ হয়, তার পরিপ্রেক্ষিতে হরতাল নিষিদ্ধ করার দাবি অনেকের কাছেই যৌক্তিক মনে হয়। কিন্তু নাগরিক অধিকার কর্তন করে যেমন নাগরিক স্বাধীনতা রক্ষা করা যায় না, তেমনি হরতাল নিষিদ্ধ করেও দেশের জনজীবন ও অর্থনীতিকে দুর্ভোগমুক্ত করা যাবে না। তখন সন্ত্রাস নতুন নামে জনজীবনে আরও বড় দুর্ভোগ সৃষ্টি করবে। সমস্যার মূল হরতালে নয়, এই মূলটির উৎস সন্ত্রাস।
আধুনিক হরতালের জনক মহাত্মা গান্ধী বলেছেন, 'নাগরিকদের অধিকার ও দাবি-দাওয়া আদায়ের আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায় হচ্ছে হরতাল ও ধর্মঘট। তা যখন-তখন বা ঘন ঘন ডাকা চলবে না। দাবি আদায়ের অন্য পন্থাগুলো ব্যর্থ হলে তখন এমনভাবে হরতালের ডাক দিতে হবে, যে ডাকের পেছনে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন থাকবে। এই সমর্থন না থাকলে হরতাল ডাকা চলবে না। জোর খাটিয়ে জনগণের দ্বারা হরতাল পালন করাতে গেলে তা হরতাল নয়। হরতালের সঙ্গে হিংসা যুক্ত করা হলেই হরতাল বন্ধ করে দিতে হবে।
মহাত্মা গান্ধী তার এই কথা কাজে প্রয়োগ করে দেখিয়েছেন। ব্রিটিশ আমলে চৌরিচেরির ঘটনায় যখন হরতাল ডাকা হয়, তখন হিংসাত্মক ঘটনা ঘটার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি আন্দোলন বন্ধ করে দিয়েছিলেন। ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলনের শর্ত ছিল, এই অসহযোগ অহিংস হতে হবে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সূচনায় বঙ্গবন্ধু প্রথমে অহিংস-অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিয়েছিলেন। আপামর দেশের মানুষ তাতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে যোগ দিয়েছিল। ফলে আন্দোলনটি সফল হয় এবং গণযুদ্ধে পরিণত হয়।
হালে বাংলাদেশে বিএনপির ডাকা হরতালগুলোর দিকে তাকালে দেখা যাবে, এর চরিত্র প্রকৃত হরতালের নয়। হরতাল ডাকার জন্য জনগণের সম্মতি বা সমর্থনের তোয়াক্কা করা হয় না। জনসাধারণ না চাইলেও সন্ত্রাস সৃষ্টি দ্বারা জনগণকে হরতাল পালনে বাধ্য করা হয়। দোকানপাট, বাস পুড়িয়ে, নিরীহ মানুষ হত্যা করে এমন বিভীষিকা সৃষ্টি করা হয়, যার উদ্দেশ্য জনগণের দাবি-দাওয়া আদায় করা নয়; উদ্দেশ্য সন্ত্রাস দ্বারা অরাজকতা সৃষ্টি করা এবং গণতান্ত্রিক সরকারকে অগণতান্ত্রিক পথে ক্ষমতা থেকে উচ্ছেদের চেষ্টা করা। কোনো ক্ষমতাসীন সরকারের মনে অসাধু উদ্দেশ্য থাকলে বিরোধী দলের এই ধরনের জনসমর্থনহীন কার্যকলাপকে অজুহাত হিসেবে খাড়া করে শুধু হরতাল নয়, সকল নাগরিক অধিকারই স্থায়ী বা অস্থায়ীভাবে বাতিল করে দিতে পারে। নাগরিক অধিকারের সঙ্গে সঙ্গে মানবাধিকারও তখন বিপন্ন হয়। এশিয়া, আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকার বহু দেশে এ ধরনের বহু ঘটনার উদাহরণ আছে।
বিএনপির সাম্প্রতিক হরতালগুলোতেও প্রমাণিত হয়েছে, এই হরতালের পেছনে জনসমর্থন নেই। জনসমর্থন থাকলে বলপ্রয়োগে বা হত্যা, অগি্নকাণ্ড দ্বারা ভীতি সৃষ্টিপূর্বক তারা সাধারণ মানুষকে হরতাল পালনে বাধ্য করার চেষ্টা করতেন না। হরতাল স্বতঃস্ফূর্তভাবে সফল হতো। অতীতে এমনকি ১৯৯৬ সালেও বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে হরতাল ও আন্দোলনে আওয়ামী লীগ যে সফল হয়েছে, তার কারণ তার পেছনে স্বতঃস্ফূর্ত জনসমর্থন ছিল। ফলে সেই আন্দোলনে খালেদা জিয়াকে ক্ষমতা ছাড়তে হয়েছিল। বর্তমানে ইলিয়াস আলী ইস্যু বা বিএনপির নেতাদের গ্রেফতারের ইস্যুতে হরতাল ডেকে বলপ্রয়োগে তা সফল করতে গিয়ে বিএনপি ব্যর্থ হয়েছে। তাদের আন্দোলন কোনো গতি পায়নি। মাঝখানে হরতালকে তারা দুর্নামগ্রস্ত করেছেন।
হরতালকে এই দুর্নাম থেকে মুক্ত করতে হবে। বাকস্বাধীনতা বা সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিয়ে বাড়াবাড়ি হলেও যেমন কেউ বলে না, এই স্বাধীনতা বাতিল করা হোক, হরতালের বেলাতেও তেমনি তার অপব্যবহারের বাড়াবাড়িতে হরতাল নিষিদ্ধ করা অযৌক্তিক। তাতে নাগরিক অধিকার হরণ করা হবে, জনগণের দাবি আদায় এবং বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ জানানোর শান্তিপূর্ণ পন্থাগুলো রোধ করা হবে। তাতে সেই বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ প্রকাশকে হিংসা ও অশান্তির পথেই ঠেলে দেওয়া হবে মাত্র।
যেটা আজ করা দরকার তাহলো, হরতালকে সন্ত্রাসমুক্ত করা। রাজনৈতিক দলগুলোর আজ এই ঐকমত্যে পেঁৗছা দরকার। গণতন্ত্রের বৃহত্তর স্বার্থে, তারা জনগণের ইচ্ছার বাইরে, বলপ্রয়োগ বা হিংসাত্মক পন্থার সাহায্যে হরতাল ডাকতে যাবেন না। সরকারও এ ধরনের আইন করতে পারে যে, কোনো দলের ডাকা হরতালে যদি নাগরিকদের জানমালের ক্ষতি হয়, তাহলে সেই দলটিকে যথোপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। আর হরতালের নামে দেশে এখন যা হচ্ছে, তা যে হরতাল নয়, বরং সন্ত্রাস এবং বৃহত্তর সন্ত্রাসী লক্ষ্যের অংশ, তা দেশের নাগরিক সমাজকেও বুঝতে হবে। হরতাল নিষিদ্ধ করা নয়, হরতালের মুখোশের আড়ালে যে সন্ত্রাস দেশের গোটা রাজনীতিকেই গ্রাস করতে চাইছে, গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাগুলোকে কলঙ্কিত করতে চাইছে, তার বিরুদ্ধে দেশে সচেতন ও ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তোলা প্রয়োজন। নইলে আজ হরতাল নিষিদ্ধ করা হলে আগামীকাল অন্য গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াগুলোকেও বাতিল অথবা নিষিদ্ধ করার দাবি তুলতে পারে অপশক্তি।
দেশে দেশে গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া রক্ষায় মার্কিন ভূমিকা মোটেই উজ্জ্বল নয়। 'আমি হরতাল ঘৃণা করি' বলতে মার্কিন রাষ্ট্রদূত মজিনা সাহেব কী বুঝিয়েছেন, তার সমালোচনার লক্ষ্য সন্ত্রাস, না হরতাল, তার একটা ব্যাখ্যা দিলে আমরা সন্দেহবাদীরা সন্দেহমুক্ত হতে পারি।
লন্ডন, ১ জুন ২০১২, শুক্রবার